তালেবানের হাতে কাবুলের পতনের তিন দিনের মধ্যেই আফগানিস্তানে ফিরেছেন সংগঠনের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লাহ আবদুল ঘানি বারাদার। নতুন একটি সরকার গঠনের জোর তত্পরতা শুরু হয়েছে এবং তালেবানের সরকার হবে—এ নিয়ে তেমন কোনো সন্দেহ আর নেই। যদিও হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা তালেবানের আমির বা শীর্ষ নেতা, কিন্তু এখন পর্যন্ত যে ইঙ্গিত তা হলো কাবুলে আসন্ন সরকারের প্রধান হতে চলেছেন তার ডেপুটি মোল্লাহ বারাদার।
‘আফগানিস্তানে তালেবানের সরকারই আসছে এবং বারাদারই যে তাদের ইসলামি আমিরাতের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন, তা নিয়ে আমার খুব একটা সন্দেহ নেই।’ বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং আফগান রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. আসিম ইউসুফজাই। তিনি মনে করেন, তালেবানের মধ্যে বারাদারই এখন বাকি বিশ্বের কাছে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, তালেবানের বিভিন্ন অংশের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ভালো এবং বোঝাপড়া করে জটিলতার মীমাংসা করার ক্ষমতা তার রয়েছে। খবর বিবিসি বাংলার।
কাবুল দখলের পর অনেকের মনেই এ প্রশ্ন উঠেছে যে কেমন মানুষ এই মোল্লাহ আবদুল ঘানি বারাদার? কীভাবে তার এই উত্থান? ‘বারাদার কঠোর হাতে আফগানিস্তান শাসন করবেন। খুব শক্ত মনের মানুষ তিনি, খুবই শক্ত নেতা। দীর্ঘ আট বছর পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন তিনি, কিন্তু তাতে একটুও ভাঙেননি।’ বলছেন ড. ইউসুফজাই। আপাতদৃষ্টিতে যে মানুষটি এখন ঠান্ডা মাথার একজন মানুষ, যিনি দোহায় বসে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে আপস-মীমাংসা করছেন, বিদেশ সফর করছেন, তার আড়ালে রয়েছে দীর্ঘ লড়াইয়ে পোড় খাওয়া শক্ত একজন যোদ্ধা।
মোল্লাহ বারাদারের জন্ম আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের উইটমাক নামে একটি গ্রামে। তিনি বড় হন দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কান্দাহারে। সেখানেই একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। জাতিগত পশতুন বারাদার ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্যদের বিরুদ্ধে ১০ বছর যুদ্ধ করেন। এরপর আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চলার সময় মোল্লাহ মোহাম্মদ ওমরের নেতৃত্বে ১৯৯৪ সালে যে কয়েক জন পশতুন মুজাহিদিন তালেবান প্রতিষ্ঠা করেন, মোল্লাহ বারাদার ছিলেন তাদের একজন। মোল্লাহ ওমরের ডান হাত ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে যখন তালেবান কাবুল দখল করে, তখন সেই সরকারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন মোল্লাহ বারাদার। ২০০১ সালে আমেরিকার হামলায় তালেবান ক্ষমতা হারানোর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী।
২০১০ সালে করাচিতে পাকিস্তানের পুলিশ মোল্লাহ বারাদারকে আটক করে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তখন এমন খবর বেরিয়েছিল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মুক্তি চেয়েছিলেন। কারণ আমেরিকা আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ করার জন্য তালেবানের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেই লক্ষ্যে ঐ সংগঠনের একজন প্রভাবশালী নেতার খোঁজ করছেন। এই খবর সত্য প্রমাণিত হয়, যখন মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পরই বারাদার দোহায় গিয়ে তালেবানের রাজনৈতিক অফিসের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিতে তালেবানের পক্ষে তিনিই সই করেন।