করোনা পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হইলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার পরিকল্পনার কথা গতকাল জানাইয়াছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যতদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়া যাইতেছে না, ততদিন ভার্চুয়ালি হইলেও শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখিবার নির্দেশ দিয়াছেন তিনি। এইদিকে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকিবার কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে চিড় ধরিতেছে। স্কুলের মাঠে নাই তাহাদের ছুটাছুটি-খেলাধুলা, বন্ধুদের সান্নিধ্যও মিলিতেছে না। একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, তাহাদের মনের কথা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গেও শেয়ার করিতে পারিতেছে না। তাহা ছাড়া করোনাকালে অনেক অভিভাবকের চাকরি চলিয়া গিয়াছে, আর্থিক সংকট তৈরি হইয়াছে। চারিপাশে আত্মীয়-পরিজনের প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সংবাদ পাইতেছে। সকল কিছু মিলাইয়া একদমই ভালো নাই কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মন। জরিপে দেখা গিয়াছে, করোনাকালে ৬১.২ শতাংশ তরুণ-তরুণী বিষণ্নতায় ভুগিতেছে। এমনকি ২১.৩ শতাংশ তরুণ-তরুণীর ভাবনায় আত্মহত্যার চিন্তাও আসিতেছে! এই অবস্থায় শিক্ষার্থীদের অভিভাবককে আগাইয়া আসা দরকার। এই প্রতিকূল অবস্থায় সৃষ্ট শিশু-কিশোরদের মানসিক জটিলতাকে সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখিতে হইবে।
করোনা আসিয়া শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে নিদারুণ বৈষম্যমূলক পরিবেশও সৃষ্টি করিতেছে। যেমন, শহরের নামিদামি কিছু স্কুল অনলাইনে ক্লাস লইতেছে, অথচ মফস্সল ও শহরের নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা রহিতেছে সম্পূর্ণই পড়ালেখার বাহিরে। ফলে গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থী এবং ধনী ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হইতেছে ব্যাপক বৈষম্য। গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত এডুকেশন ওয়াচ রিপোর্টে বলা হইয়াছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে দূরশিক্ষণে (সংসদ টিভি, অনলাইন, রেডিও ও মোবাইল ফোন) ৩১.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশ লইয়াছে। অর্থাত্ ৬৯.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো ধরনের অনলাইন শিক্ষার আওতায় আসে নাই। যেই সকল শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণ প্রক্রিয়ার বাহিরে রহিয়াছে তাহাদের মধ্যে ৫৭.৯ শতাংশ ডিভাইসের অভাবে অংশ লইতে পারিতেছে না। আর গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৬৮.৯ শতাংশ। সুতরাং ইহা স্পষ্ট করিয়া বলা যায়, আমাদের সর্বজনীন শিক্ষা করোনা আসিয়া আর সর্বজনীন রাখিতেছে না। বৈষম্য তৈরি হইতেছেই। যতই ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হউক, গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ অত্যন্ত দুর্বল। অন্যদিকে গরিব ছাত্রছাত্রীদের ল্যাপটপ/কম্পিউটার/স্মার্টফোন নাই। তাহা ছাড়া বিপুলসংখ্যক স্কুল-কলেজগুলিতে অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা এখনো বহু যোজন দূরে। মনে রাখিতে হইবে, ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ ও হাইস্পিড ইন্টারনেট আবশ্যিক। সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, ডিজিটাল শিক্ষা ডিজিটাল বিভাজনও তৈরি করিতেছে। কিছুদিন পূর্বে ইউনেসকো বলিয়াছে, ‘ইহা একটি ভয়াবহ বিভ্রম যে, অনলাইন শিক্ষা সকলের জন্য আগাইয়া যাইবার পথ।’ তাহাদের মতে, অনলাইন শিক্ষা শুধু গরিব দেশে নহে, বিশ্বের ধনী দেশগুলিতেও বৈষম্য বাড়াইতেছে।
আরেকটি কথা মনে রাখিতে হইবে, শিক্ষা কোনো সফটওয়্যার নহে যে উহাকে কোনোভাবে শিক্ষার্থীদের মাথায় ইনস্টল করাইয়া দিলেই কেল্লা ফতে। বরং শিক্ষার সহিত মানসিক সংযুক্তি গভীরভাবে জড়িত। এই ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন—‘গুরু-শিষ্যের পরিপূর্ণ আত্মীয়তার সম্বন্ধের ভিতর দিয়াই শিক্ষাকার্য সজীব দেহের শোণিত স্রোতের মতো চলাচল করিতে পারে।’ শিক্ষকরাই ছাত্র তৈরি করেন, কেবল ক্লাসে লেকচার দিয়াই নহে, নিজের চরিত্র, জীবনের প্রভাব দিয়াও। ইহা যুগে যুগে পরীক্ষিত সত্য। সুতরাং ডিজিটাল শিক্ষা প্রথাগত শিক্ষার বিকল্প নহে, সহায়ক হইতে পারে মাত্র। তাহা ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহা কিন্তু অনলাইনে সম্ভব নহে। আমরা মনে করি, সরকার যেমন বড় বড় প্রকল্প লইতেছেন, শিক্ষা লইয়াও তেমন প্রকল্প লওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে, শিক্ষায় ডিজিটাল বৈষম্য দূর করিতে সরকার পিছাইয়া পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর কোনো পথ বাহির করিতে হইবে।