শতবর্ষ পার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষাঙ্গন মানুষ তৈরির কারখানা যেখানে শিশু তার মানসিক বিকাশের পাশাপাশি মূল্যবোধ নিয়ে বড় হয়ে উঠে। এরপরে শিশুরা কৈশোর পেরিয়ে কলেজ শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক মূল্যবোধের বীজ বপন করাটা খুবই জরুরি। তবে এসব ছাপিয়ে শিশুর অন্তরে বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল বা ব্যারিস্টার হবার চিন্তা ঢুকাতে গিয়ে তাকে আসল মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি আমরা। এভাবে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা দেশ গঠনে কতটুকু অবদান রাখতে পারবে? বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে শিক্ষার্থী তাকে মার্জিত করবে, তার জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরো কঠোর অধ্যবসায় করতে থাকবে; কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় অবহেলার কারণে গোড়াতেই গলদ থেকে যাচ্ছে। ফলে শুরুতেই যেরকম শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার সান্নিধ্য পাওয়ার কথা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুরা তার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সেই জ্ঞানের ভান্ডার পণ্ডিতমশাইদের সাহচর্য পাওয়াটাও আজ বড়ই অপ্রতুল। সুতরাং যারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নিয়ে কথা বলেন, যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মানে মন ভরে না তারা দয়া করে প্রাথমিক স্তর এবং একমুখী শিক্ষা নিয়ে যদি একটু হইচই করে বাস্তবায়ন করতেন তাহলে আরো উপকৃত হওয়া যেত। অন্যদিকে শিক্ষিত সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশ সন্তানদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সবকিছু মিলিয়ে যে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে সেটা পূরণ করছে কে? নিশ্চয়ই যেই মেধাটাকে সামনে পাওয়া যাচ্ছে তাকে দিয়ে অথবা এই মেধা দিয়ে না পোষালে বিদেশ থেকে মেধা ভাড়া করে এনে। শুধু অর্থনৈতিকভাবে সত্ হলেই চলবে না। আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভাবেও সত্ হতে হবে। এই মূল্যবোধটা আজ বড় প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামটির সঙ্গে দেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতির ভাগ্য তৈরির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের জীবনের ইতিহাস ও অবদান জড়িয়ে রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে পরিবারের প্রাক্তন ও বর্তমান সবার আবেগ জড়িত। উচ্চশিক্ষার বিদ্যায়তনটি ১০১ বছরে পদার্পণ করল। অনেকেই বলেন—১০০ বছরের বার্ধক্যগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানটি আর সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো জীবনীশক্তি ধরে রাখতে পারছে না। আবার কেউ বলেন—বর্ষীয়ান বিদ্যাপীঠটি সময়ের সঙ্গে আরো শানিত, ধারালো হয়ে তার অপার অভিজ্ঞতার ঝুলি দিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষাকে আরো শক্তিশালী করে জাতি গঠনে সামনে থেকে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে যাবে এবং এই চাওটাই বাঞ্ছনীয়। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং নিয়েও অনেক কথা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা প্রধানত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর অনুপাত, শিক্ষকের অনুপাত, শিক্ষক ছাত্র অনুপাত, গবেষণার মান, শিক্ষক প্রতি গবেষণার উদ্ধৃতি, একাডেমিক খ্যাতি, নিয়োগকারী দ্বারা প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রীদের কাজের দক্ষতার খ্যাতি ইত্যাদি মানদণ্ড বিচারে র্যাংকিং করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো QS World University Ranking (QSWUR), Times Higher Education World University Ranking (THEWUR) এবং Center for World University Ranking (CWUR)। QSWUR অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ২০১২ সালে ছিল ৬০০-এর মধ্যে, ২০১৪-২০১৮ পর্যন্ত ছিল ৭০১-৭৫০-এর মধ্যে আর ২০১৯-২০২০ সালে ছিল ৮০১ থেকে ১ হাজারের মধ্যে। অন্যদিকে THEWUR অনুযায়ী ২০১৬ সালে অবস্থান ছিল ৬০১-৮০০; কিন্তু ২০১৮ থেকে নেমে যায় ১ হাজারের পরে। দুঃখজনক হলেও সত্যি CWUR মানদণ্ডে প্রায় ২০ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০২০ সালে ঢাবির অবস্থান ছিল ১ হাজার ৭৯৪। র্যাংকিংয়ের একটি অন্যতম প্রধান মানদণ্ড গবেষণা। THEWUR মতে ২০১৬ সালে গবেষণায় ঢাবি ৭ দশমিক ২ পয়েন্ট পেয়ে ৬০০-৮০০-এর মধ্যে থাকলেও ২০২০ সালে পয়েন্ট কিছুটা বাড়লেও (৮ দশমিক ৮) ১ হাজারের পরে অবস্থান চলে যায়। কেন তবে কিছু বেশি নম্বর পাওয়ার পরেও পিছিয়ে পড়েছি? আসলে অন্যরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে। উল্লেখিত যেই পদ্ধতিটিই বিবেচনা করি না কেন উপরের সারিতে চার-পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কেই ঘুরেফিরে দেখা যায়। তাদের বাত্সরিক বাজেটের দিকে একটু তাকালে দেখতে পাব ২০১৯-২০২০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ছিল ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ দশমিক ১৪৫ বিলিয়ন পাউন্ড (২৫ হাজার কোটি টাকা), কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ দশমিক ৩০৮ বিলিয়ন পাউন্ড (২৭ হাজার কোটি টাকা), স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (৫৫ হাজার কোটি টাকা), একটু নিচে থাকা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল ২ দশমিক ৩৩৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা)। যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০২০ সালের বাজেট ছিল ৮১০ দশমিক ৩২ কোটি টাকা যার মাত্র ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ ছিল গবেষণার জন্য। তাহলে দেখা যাচ্ছে স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের বাজেট আমাদের এবছরের জাতীয় শিক্ষা বাজেটের (৭১ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা) চার ভাগের এক ভাগ থেকে অর্ধেকেরও বেশি। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এনডাওমেন্ট ফান্ডের কথা নাইবা বললাম। জীববিজ্ঞানের ছাত্র ও একজন গবেষক হিসেবে বুঝি যে এখানে লগ্নি অনেক এবং এই বরাদ্দ ফেরত আসতেও পারে নাও পারে; কিন্তু একটা সফলতাই শতাব্দীর লগ্নিকে ফেরত দিতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে একজন গবেষক তথা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বাড়ে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা বাড়ে। আর এটা করতে হলে গবেষণা কাজটি স্বনামধন্য সাময়িকীতে প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন ও অংশগ্রহণ করাটা খুবই জরুরি। নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে আমাদের গবেষণাকর্ম পূর্বে বিনে পয়সায় প্রকাশ করা যেত যা প্রকাশিত হবার পর সবাই পড়তে ও জানতে পারত; কিন্তু বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদন ২০০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠে যাবার পর অনেকেই আমাদের জন্য এই সুযোগটি বন্ধ করে দিয়েছে। একটি ভালো প্রকাশনার মূল্য এখন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকার সমপরিমাণ। যেখানে একটা গবেষণা কর্মের জন্য বছরে গড়ে দুই থেকে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয় (কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, যেমন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, HEQEP থেকে বরাদ্দ) সেখানে কীভাবে গবেষণালব্ধ ফল প্রকাশের মাধ্যমে অন্যের সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করা যাবে? কীভাবেই-বা একজনের অভিজ্ঞতা বা কাজের উদ্ধৃতি বাড়বে বা একজনের গবেষণাকে অনুসরণ করবে অন্য গবেষকরা? অন্যদিকে অনেক প্রকাশক বিনে পয়সায় প্রকাশনার জন্য এমন ব্যবস্থা করেছে যেখানে আপনার প্রবন্ধটি কেউ পড়তে চাইলে তাকে পয়সা দিয়ে কিনে পড়তে হবে।
হ্যাঁ, পুরো সমাজের সঙ্গে এই বিদ্যাপীঠও অবক্ষয়ের শিকার। যারা অনেক তত্ত্ব ও তথ্যের মাধ্যমে কথা বলেন তারা অনেকেই পৃথিবীর অনেক নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কোথাও কি দেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তার পরিবেশের এরকম হযবরল অবস্থা। আসলেই কি ৬০০ একর এলাকা দিয়ে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে ২০০ একরের কিছু বেশি এলাকা নিয়ে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার বাহ্যিক শিক্ষার পরিবেশটাকে ধরে রাখতে পেরেছে? যে পরিবেশে নিরাপদ উপলব্ধি করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে, যেখানে রাস্তায় চলতে গেলে নাকে রুমাল চেপে সজাগ দৃষ্টি দিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে হয়, যেখানকার ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের চারপাশে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য সেখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা কতটুকু হবে? যেখানকার দালানকোঠার মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিন্তু রাস্তাঘাটের মালিকানা রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রের হাতে সেখানে তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদর্শিত হবেই। সেখানে কুয়োর ব্যাঙ হিসেবে বাঁচতে হবে সাগর আর দেখা হবে না। সবশেষে গৌরবগাথা অতীতে যেমন ছিল গৌরব করার বিষয় এখনো আছে। তফাতটা হলো পূর্বে অল্পের মধ্যে অনেক মনে হতো আর এখন অনেকের মধ্যে অল্পটা হারিয়ে যায়।
n লেখক : অধ্যাপক ও গবেষক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়