যমুনার ভাঙনে আশ্রয়হারা আড়াই হাজার মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের পাঁচটি চরে যমুনা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি। দুই মাস ধরে চলা ভাঙনে আশ্রয়হারা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। গত সোমবার সরেজমিনে নদীভাঙনের শিকার মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জনপদের মধ্যে আছে দলিকার চরে ৩০০ বসতবাড়ি, হাটবাড়ী চরে ৮০, কাশিরচরে ৫০, শিমুলতাইড় চরে ৫০ এবং নোয়ারপাড়া চরে ৩০টি বসতবাড়ি। এ ছাড়া যমুনাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে চর দলিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর কাশিরপাড়া চরে স্থানান্তরের পরও হুমকির মুখে ভাংগুরগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাটবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং শিমুলতাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

দলিকার চরে গিয়ে দেখা গেছে, মানচিত্র থেকে চরটি বিলীন হওয়ার পর সেখানে বইছে এখন যমুনার প্রবল সে াত। নিশ্চিহ্ন এই চরের নিশানা থেকে নৌকায় কয়েক কিলোমিটার পথ পেরিয়ে জামালপুরের ইসলামপুরের সীমান্তবর্তী কালিরচরের কাছাকাছি যমুনার বুকে জেগে ওঠা একটি চরে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় সদ্য গড়ে ওঠা নতুন জনপদের দেখা পাওয়া গেল। কোনো রকমে টিনের বেড়ার ঘর তুলে আশ্রয় নিয়েছে হাজারো মানুষ। স্থানীয় লোকজন জানায়দলিকার চরের বেশির ভাগ মানুষের জীবিকা চলে যমুনায় মাছ ধরে। নদীভাঙনে আশ্রয় হারিয়ে চরের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দলিকার চরের লাইলী বেগম (৬৫) বলেন, দুই মাস আগেও এ চরের ৩০০ পরিবারের বসবাস ছিল নদীর পার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। সেখানটায় এখন যমুনার প্রবল সে াত। চরের বাসিন্দা আমির শেখ (৭০) বলেন, ‘দলিকার চরে আসলাম, আবারও বাড়ি ভেঙে গেছে। এখন কোথায় যাব। এই বয়সে ১৯ বার বাড়ি বানিয়েছি, ২০ বার ভাঙছে। পরথম ছিলাম বনসার চরে, তারপর রায়পুর। তারপর মানিকদাইড়। তারপর মূলবাড়ি, ফের দলিকা, ফের মাসিকদাইড়-জামালপুর। জামালপুর থন ফিরে বাড়ি করিচনু দলিকার চরত। সেটাও ভাঙল।’ যমুনাগর্ভে বিলীন হয়েছে হাটবাড়ী চরের ৮০টি বসতবাড়ি। বসতভিটা হারিয়ে এসব পরিবার আশ্রয় নিয়েছে পাশের চরে। যমুনার প্রবল ভাঙনে হুমকির মুখে হাটবাড়ী চর। আশ্রয় হারানোর আতঙ্কে আরো ৩০০ পরিবার। হাটবাড়ীর চরে ছোট একটা মুদিদোকান চালাতেন আবদুর রাজ্জাক। নদীভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হওয়ার পর এখন দিশেহারা তিনি। বলেন, ‘যমুনায় সব শ্যাষ। বসতঘর, বাপের কবর। এখন একবেলা খায়্যা দিন যাচ্ছে।’ যমুনায় মাছ ধরে জীবিকা চলে হাটবাড়ী চরের রফিকুল ইসলামের।

নদীভাঙনে হুমকির মুখে চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের কাশিরপাড়া চর। গত এক মাসে এ চরের অর্ধশত বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে। আরো শতাধিক বসতবাড়ি হুমকির মুখে। ভাংগুরগাছা চর বিলীন হওয়ার পর দুই বছর আগে ভাংগুরগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাশিরপাড়া চরে স্থানান্তর করা হয়। নদীভাঙনে যমুনা ধেয়ে আসায় এখন এই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আবারও ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। নদীভাঙনে দিশেহারা শিমুলতাইড় ও নোয়ারপাড়া চরের বাসিন্দারাও। গত এক মাসে শিমুলতাইড় চরের ৫০ পরিবার এবং নোয়ারপাড়া চরের ৩০ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। নদীভাঙন অব্যাহত থাকায় দুই চরের মানুষের এখন নির্ঘুম রাত কাটছে। হুমকির মুখে পড়েছে শিমুলতাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সারিয়াকান্দি উপজেলার চালুয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শওকত আলী বলেন, যমুনার ভাঙনে দুই মাসে এই ইউনিয়নের পাঁচ চরের বিলীন হয়েছে ৫১০টি বসতবাড়ি। আশ্রয় হারিয়েছে আড়াই হাজার মানুষ। বসতভিটা হারিয়ে দিশেহারা চরের মানুষ। সারিয়াকান্দির ইউএনও মো. রাসেল মিয়া বলেন, যমুনার চরাঞ্চলে নদীভাঙনের তাণ্ডব আছে। ভাঙনে আশ্রয়হারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসহ চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নে দরিদ্র পরিবারের মধ্যে ত্রাণসহায়তা বিতরণের জন্য ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভাঙনকবলিত মানুষকে আরো ত্রাণ দেওয়া হবে। বগুড়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, চরে নদীভাঙন ঠেকাতে এখনো কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। তবে চরের ভাঙন ঠেকাতে আগামী দিনে প্রকল্প প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।