ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের ফোনালাপ ফাঁস এবং কলেজটির নানা অনিয়মের প্রেক্ষাপটে যে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তাদের তদন্ত প্রতিবেদন এ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েনি। কবেনাগাদ জমা দিতে পারবে তাও বলতে পারছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তিন দিনের মধ্যে যে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল, ২১ দিন পেরিয়ে গেলেও তা জমা পড়েনি। আর ১৫ দিন সময় দিয়ে যে কমিটি করা হয়েছিল সেই তদন্তের অগ্রগতিও সামান্য। এই কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়ও পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েক দিন আগে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হওয়া ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কামরুন নাহারের হুমকির ঘটনায় গত ২৭ জুলাই তদন্ত কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরীক্ষা ও আইন) খালেদা আক্তারকে প্রধান এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ বেলাল হোসাইনকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে পরবর্তী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। এরই মধ্যে ২১ দিন পেরিয়েছে, কিন্তু এই সময়ে রিপোর্ট দিতে পারেনি কমিটি।
তদন্ত কমিটির সদস্য মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে বলতে রাজি হননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই জানাবে। আর খালেদা আক্তারের মোবাইল ফোনে কল করে সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দিয়ে কমিটি এ জন্য সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছে।
অভিভাবক ফোরামের নেতা মীর সাহাবুদ্দিন টিপুর সঙ্গে একটি ফোনালাপে অধ্যক্ষ কামরুন নাহারকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি যেমন শিক্ষক, তেমনি রাজনীতি করা মেয়ে। আমি বালিশের নিচে পিস্তল রাখি। তার বক্তব্যে দেশে শিক্ষা সমাজে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ তার ফোনালাপের বিষয় জানিয়েছেন, সুপার এডিট করা হয়েছে। তবে সাহাবুদ্দিন টিপু দাবি করেছেন, ফোনালাপটি অধ্যক্ষ ও তার মধ্যে হয়েছে। এ ঘটনার পর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের অধ্যক্ষকে পদ থেকে অপসারণ ও একই সঙ্গে গভর্নিং বডি বাতিল করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করার দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন সংগঠন।
অন্যদিকে শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, ভর্তিসহ কলেজের যাবতীয় কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ, ভর্তি বাণিজ্য ও কলেজের উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজে আর্থিক অনিয়মের চেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করেছিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডও। গত ১৮ জুলাই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল মনছুর ভূঞাকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সরেজমিন তদন্ত করে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে শিক্ষা বোর্ডে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। তদন্ত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আবুল মনছুর ভূঞা বলেন, লকডাউনের কারণে তদন্ত কাজে বিলম্ব হয়েছে।
এর আগে জুলাই মাসের শেষে জমা দেওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে নানা অনিয়মের চিত্র ফুটে ওঠে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ভিকারুননিসার সব আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে দেখেছে এ প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে প্রতিষ্ঠানটির খরচের ৫ কোটি টাকার লেনদেন গরমিল পেয়েছে।
বসুন্ধরা শাখার জন্য কেনা ১১ লাখ ১৬ হাজার টাকার আসবাবপত্রের হদিস পাওয়া যায়নি। এছাড়া টেন্ডার ছাড়া ১ কোটি ৭১ লাখ ৭২৭ টাকার অস্পষ্ট ব্যয়, বসুন্ধরা শাখার একটি ভবনের দুটি ফ্লোর নির্মাণে ১ কোটি ৫৯ লাখ ১১ টাকার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে অনিয়ম, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনায় ৩২ হাজার ৯০০ টাকা অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, বিভিন্ন কাজে সরকারকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও ৪৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা ভ্যাট এবং বিভিন্ন সম্মানির ক্ষেত্রে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা উেস কর বঞ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার পর রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালিত হতো বিশেষ কমিটির মাধ্যমে। ১৯৯৪ সালের পর নির্বাচিত গভর্নিং বডির মাধ্যমে পরিচালনা শুরু হয়। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে ভর করে অনিয়ম-দুর্নীতি।