পি কে হালদার সিন্ডিকেটের অর্থ কেলেঙ্কারি

এমডি রাসেলের একক স্বাক্ষরেই ৭০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ

একটা সিন্ডিকেট তৈরি করে পি কে হালদার একে একে লিজিং ফার্মগুলো লুট করেছেন। পি কে হালদারের সহযোগী উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সিদ্দিক, জাহাঙ্গীর, রাসেল শাহরিয়ার তিনটি লিজিং ফার্ম লুট করে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লি. থেকে লুট করা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্সের এমডি রাসেল শাহরিয়ারের একক স্বাক্ষরেই যাচাই-বাছাই ছাড়া ৭০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদক সূত্র বলছে, ২০১৪ সালের শেষের দিকে পি কে সিন্ডিকেট শেয়ার ক্রয় করে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। এরপর কৌশলে পুরোনো কর্মচারীদের ছাঁটাই করে তাদের পছন্দ মতো কর্মচারী নিয়োগ করে পি কে সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের উজ্জ্বল কুমার নন্দী তার পছন্দ মতো এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগ দেন। সিদ্দিকুর রহমান এবং জাহাঙ্গীর আলম হলেন পি কে হালদারের বন্ধু এবং ব্যবসায়িক পার্টনার। সে সুবাদে এফএএস ফাইন্যান্সের দায়িত্ব পড়ে সিদ্দিক ও জাহাঙ্গীরের হাতে। তারা রাসেল শাহরিয়ারকে এমডি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। এই রাসেল শাহরিয়ার পি কে হালদারের পূর্বপরিচিত এবং ২০০৭ সালে তারা একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। 

দুদক সূত্র অনুসন্ধানে আরও প্রমাণ পেয়েছে, অস্তিত্বহীন কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে হবে এ সিদ্ধান্ত আগেই পি কে হালদার দিয়ে দিতেন। লোক দেখানো বোর্ড মিটিং হতো এবং বোর্ডে এমডিকে ডেকে বলে দেওয়া হতো ‘এসব বোর্ডের ফাইল এবং দ্রুত ঋণের ব্যবস্থা কর।’ রাসেল শাহরিয়ার সুবোধ বালকের মতো যাচাই ছাড়াই এবং কোনো মর্টগেজ না নিয়েই তার একক স্বাক্ষরে ক্রেডিট মেমো প্রস্তুতের পর তা বোর্ডে উপস্থাপন করে ঋণ অনুমোদন করে নিত। এরপর ঋণের অর্থ পি কে সিন্ডিকেটের হিসাবে পাঠিয়ে দিত। টেকওভার করা ঋণের অর্থও টেকওভারকৃত প্রতিষ্ঠানের হিসাবে না দিয়ে পি কে সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত এবং বিভিন্ন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিত। এভাবে ২০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়, যার কোনো অর্থ উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের হিসাবে যায়নি। উক্ত অর্থ পি কে সিন্ডিকেটের বিভিন্ন হিসাবে বিতরণ করা হয়েছে।

এই ২০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠান হলো—এস এ এন্টারপ্রাইজ, মুন ইন্টারন্যাশনাল লি., সুখাদা প্রোপাটিজ লি., ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ, আরবি এন্টারপ্রাইজ, দিয়া শিপিং লি., নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, নিউট্রিক্যাল লি., মেসার্স বর্ন, কনিকা এন্টারপ্রাইজ, দিনান অ্যাপারেলস অ্যান্ড বি এন্টারপ্রাইজ, এমার এন্টারপ্রাইজ, জিএন্ডজি এন্টারপ্রাইজ, তামিম অ্যান্ড তালহা, হাল ইন্টারন্যাশনাল, মেরিন ট্রাস্ট লি.,আর্থস্কোপ, এমটিবি মেরিন।

দুদকের অনুসন্ধান টিম সূত্র জানায়, এ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের রহস্য উদঘাটনে গত তিন দিনে উক্ত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ জড়িত ২২ কর্মকর্তাকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ পরিচালকগণ ঋণ অনুমোদনে তাদের অনিয়মের কথা স্বীকার করেছেন। ঋণের টাকা পুনরুদ্ধারের জন্য তারা সময় প্রার্থনা করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, পি কে হালদার প্রায় সময়ই এমডি রাসেল শাহরিয়ারের রুমে আসতেন এবং বোর্ড মিটিংয়ে প্রায়ই উপস্থিত থাকতেন। যদিও পি কে হালদার উক্ত প্রতিষ্ঠানের কেউ ছিলেন না।

ইত্তেফাক/এমএএম