মানুষের হাত ধরে মানুষই মুক্তি আনবেন —যতীন সরকার

লেখায়, বক্তৃতায়, চিন্তন ও উচ্চারণে যতীন সরকার বাংলার প্রাকৃতজনের দার্শনিক। মহর্ষি এই চিন্তক ছিয়াশিতে উপনীত হয়েছেন। ৮৬তম জন্মদিনের মাধুর্যমণ্ডিত মুহূর্তে তাঁর যাপিতজীবন ও সমকালীন নানা প্রসঙ্গ নিয়ে ইত্তেফাক সাময়িকীর জন্য কথা বলেছেন—সরোজ মোস্তফা

স্যার, কেমন আছেন? করোনার এই মহামারিকালে স্তবির পৃথিবীতে কীভাবে যাচ্ছে আপনার সময়? ৮৬তম জন্মদিনে মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপনের জন্মানুষ্ঠান কেমন উপভোগ করছেন?

যতীন সরকার : করোনার এই মহামরিকালে মনে হয় কেউ ভালো নেই। মানুষের মৃত্যুর ভার মানুষকেই বহন করতে হয়। মৃত্যুকালে, মানুষ মানুষকে স্পর্শ করবে, সেবা করবে, স্পর্শ করে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় জানাবে। কিন্তু করোনার ভয়ে সত্কারানুষ্ঠান থেকেও দূরে থাকতে হচ্ছে। বিষয়টা বিষাদের। প্রতিদিন খবর পাচ্ছি, কেউ না কেউ যাচ্ছেন। মৃত্যু তো চিরায়ত। কিন্তু করোনায় এই মৃত্যুকে মানতে কষ্ট হয়। আমার কথা যদি বলি, আমি কোনো রকম আছি। বেঁচে নেই; শুধুই আছি। আছি বলেই মানুষের ভালোবাসা পাই। মানুষ আমাকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। মানুষের ভালোবাসাই আমার শক্তি। আমি সারা জীবন প্রান্তিক জনের সাথে থাকতে চেয়েছি সেই প্রান্তিক জনের ভালোবাসা যখন পাই, খুব ভালো লাগে। মনে হয় জীবন সার্থক।

 

এই যে পৃথিবীর নানান প্রান্তের বাংলা ভাষাভাষীরা আপনার নাম জানেন, আপনাকে ভালোবাসেন, আমাদের দেশের প্রায় সব পুরস্কার-সম্মানে আপনি সম্মানিত হয়েছেন। পুরস্কারপ্রাপ্তি ও মানুষের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা আপনাকে কীভাবে প্রাণিত করে?

যতীন সরকার : শোন, নাম-যশ-পুরস্কার কিংবা অর্থবিত্ত আমি চাইনি। সাধারণ থেকে সাধারণের কথাগুলো আমি পৌঁছে দিতে চেয়েছি। কখনোই আমি লেখক খ্যাতি চাইনি। মাস্টার হওয়ার নিমগ্নতাই ছিল আমার জীবনসাধনা। সারাজীবন সেই কাজটাই করেছি। জীবনানন্দ বলেছিলেন ‘জীবনের অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা অন্য কেউ এসে বহন করুক, আমি প্রয়োজন বোধ করি না’। আমি খুব সফল মানুষ। মানুষ আমাকে ভালোবাসে, এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর নেই। সেদিন আমার বাসায় একজন সাধারণ কৃষক আমার সাথে দেখা করতে এসেছেনে। এসে বলেন, ‘আজ জীবন আমার ধন্য হয়েছে। আপনার দেখা পেয়ে মনে শান্তি পেয়েছি। আমি কোনো লেখাপড়া জানি না। মানুষের মুখে মুখে আপনার গল্পশুনে আপনাকে পরানে নিয়েছি। এই যে দেখুন, পত্রিকা থেকে এই ছবিটা কেটে আমার পকেটে রেখে দিয়েছি।’ তুমি বল, জীবনে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে। আমার লেখা, আমার কথা এই সাধারণের অন্তরকে স্পর্শ করেছে—এটাই আমার বড় পুরস্কার। আমি বাংলা একাডেমিসহ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ খেতাবে ভূষিত হয়েছি। এসব পুরস্কার আমাকে গর্বিত ও আনন্দিত করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম এই আদর ও ভালোবাসাকে আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেই।

আপনি ৮৬ বছরে পদার্পণ করেছেন। আপনার ভক্তরা আপনার শতায়ু চাইছেন। একশো বছরের জীবন পেলে কী কী করতে চান?

যতীন সরকার :চিন্তায় ও লেখার উপকরণ খুঁজতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। সেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটা কথা মার্ক্সীয় তাত্ত্বিক ধীরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন বেঁচে ছিলেন’। সত্যি সত্যি রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন লেখালেখিতে সচল ছিলেন; মানে বেঁচে ছিলেন। আমিও সারা জীবন লেখায় ও চিন্তায় বেঁচে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু এখন আমি আর বেঁচে নেই। কেবল আছি মাত্র। এই থাকার কোনো মানে নেই। একজন লেখকের কলমই যদি সচল না থাকল, তবে তাকে বেঁচে থাকা বলে না। আমাকে নিয়ে আমার ভক্ত প্রিয়জনেরা শতায়ু হওয়ার আর্শীবাদ করেন। কিন্তু আমি এই আর্শীবাদ কিংবা শুভকামনা চাই না। আমি সত্যি সত্যি মৃত্যু চাই। নিজের জীবনের মৃত্যুকামনা কেউ হয়তো করে না। কিন্তু আমি এই অসার জীবন চাই না। জীবনে কত কিছু লিখতে চেয়েছি। ভেবেছি। সেইসব আজ আর খাতায় লেখা অসম্ভব। দুরারোগ্য আর্থ্রাইটিস রোগে আমি চেয়ারে পর্যন্ত বসে থাকতে পারি না। আমি তাই, শতবর্ষের জীবন চাই না। যদি কলম ধরতে পারতাম কী যে শান্তি পেতাম!

লোকজন আমার সামনে এসে আমার লেখার প্রশংসা করে। এইসব প্রশংসার খুব মূল্য নেই। কারণ আমি জানি, এদের অনেকেই হয়তো আমার লেখাও পড়েন না। আমি চাই, আমার লেখার প্রকৃত সমালোচনা হোক। সত্য সমালোচনা হোক। আমার লেখার প্রকৃতি ও ধরন কিংবা চিন্তার ঘাটতি এবং অপূর্ণতাগুলো কেউ যদি দেখিয়ে-ধরিয়ে দেয় সত্যি সত্যি আমি খুশি হই। আমার লেখালেখি নিয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণাও হয়েছে। সেইসব লেখা ও মূল্যায়নে আমি প্রাণিত হয়েছি খুব। তবে বিধান মিত্র আমাকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রন্থই লিখেছে। গ্রন্থটির নাম ‘জ্যোতির্ময় যতীন সরকার’। ইত্যাদি প্রকাশন থেকে গত জুলাই মাসেই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। আমি মনে করি, আমার লেখালেখি ও জীবন দর্শন সম্পর্কে এটি পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রন্থ। বিধান, আমার পুত্রপ্রতিম। আমি ওকে অনেক অনেক আশীর্বাদ করি। ৮৬তম জন্মদিনে এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি উপহার।

 

আমাদের সমাজে উদার মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মানবিকতা, মননশীলতা অনেক ক্ষেত্রেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। সম্প্রসারিত হয়েছে গোষ্ঠীবদ্ধতা। গোড়া ধর্মীয় প্রভাব ও সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন এই সমাজ থেকে মুক্তি পেতে আমাদের কী করা দরকার?

যতীন সরকার : আমি দৃঢ়ভাবে মার্ক্সবাদে বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি, স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কাছে বৃহত্তর মানব সমাজ শৃঙ্খলিত থাকতে পারে না। মানুষের হাত ধরে মানুষই মুক্তি আনবেন। মানুষই মানুষের ইতিহাস রক্ষা করবেন। স্বার্থবাদীরা কখনোই ইতিহাস তৈরি করতে পারে না।

এই যে সমাজের চতুষ্পার্শ্বে মূল্যবোধের ধস নেমেছে, ক্রমাগত লক্ষ করছি সমাজটা নম্বরার্থী হয়ে টাকার পেছনে ছুটছে, সামাজিক ভারসাম্যহীনতা যেভাবে প্রসারিত হচ্ছে—এর থেকে মানুষ ও সমাজ নিশ্চয়ই ঘুরে দাঁড়াবে। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিষবাষ্পে সমাজ আজ কলুষিত। এই পশ্চাত্পদ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। এক্ষুনি সময়। এক্ষুনি রুখে না দাঁড়ালে সামাজিক মানুষ হিসেবে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে মুখ দেখাবার অবস্থা থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। এই অন্ধতা, অরাজকতা, এই সংকট ও অবস্থাকে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজন মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন অসংখ্য মানুষ। সবাইকে মানুষের ইতিহাস রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না।

 

৮৬তম জন্মদিনে আপনার ভক্ত-পাঠকদের উদ্দেশে করে কিছু বলতে চান?

যতীন সরকার : আমি চাই, সবাই ভালো থাকুক। আত্মস্বার্থে টাকার পেছনে নয়, মানুষের কল্যোণে নিয়োজিত থাকুক মানুষ। একক মানুষের কোনো শক্তি নেই। সামষ্টিক মানুষ হয়ে সবাই সবার কল্যাণ করুক। এই যে পৃথিবীব্যাপী সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের পুনরুত্থান ঘটছে এর থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে। বাংলাদেশ ও বাঙালি সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের স্থান নেই। মানুষের কাছে, সমাজের কাছে এই মেসেজ পৌঁছে দিতে হবে। মানব সমাজে প্রত্যেকের কিছু না কিছু দায়িত্ব থাকে। যে সমাজে আমি জন্মেছি, সেই সমাজের সংকটে আমি যদি ভূমিকা না রাখি তবে আমার জীবন বৃথা। প্রকৃতিতে জন্ম নেয়া বৃক্ষ-লতা-পাতা, পশু-পাখি সবাই দায়িত্ব পালন করে। আশরাফুল মাখলুকাত হয়ে মানুষ কেন তাঁর সমাজের জন্য কাজ করবে না। তাই তোমার যে-টুকু সাধ্য, তা-ই তুমি করে যাও।