কর্ণফুলীপাড়ের দাসপাড়ার প্রবেশমুখে দাঁড়ালেই আজকের কর্মযজ্ঞের অনেকটাই ঠাহর করা যায়। কয়েক জায়গায় বসে মাটির তৈরি বাহারি রং করা মনসার ঘট বিক্রয় হচ্ছে। একমুখী, দ্বিমুখী এবং পঞ্চমুখী ঘট নিয়ে সুমিতা দাসী বসেছেন বিক্রয় করতে।
পাড়ার ক্লাবঘরের সামনে প্যান্ডেল করা হয়েছে। সৌরভ কুমার শীল ব্যস্ত সমস্ত জোগাড় আত্তি করতে। শ্রাবণ মাসের শেষদিন আজ পদ্মপুরাণ গান হবে। দুপুরের পর থেকেই এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে এক-এক করে এসে জড়ো হচ্ছে সকলে। বাড়ির মালিক রুম্পা দাস খাবার জোগাড়ে ব্যস্ত। সমস্ত পাড়া খবর হয়ে গেছে, গায়েনের দল এসে পড়ল বলে। পুরুষরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত।
চট্টগ্রামের দাসপাড়ার ঘরের বৌ-ঝি আর ছোট ছেলেমেয়েরা মনসার গান নিয়ে মাসব্যাপী ব্যস্ত সময় কাটায়। প্রতিদিন দুপুরের পর সংসারের কাজ-কর্ম শেষ করে দল বেঁধে এক-এক বাড়ির উঠানে বসে পুঁথিপাঠের আসর। ২২ কবির পদ্মপুরাণ পুঁথি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধারাবাহিক পাঠ করা হয়। ঢোলক, মন্দিরা, খঞ্জনিসহ বাদকদল থাকে সঙ্গে। আজ বসেছে ঝর্ণা হোরের আঙিনায়।
‘ও মা তোমার পুঁথি তুমি পড়ো
উপলক্ষ আমি রে,
শ্রাবণ মাসের শেষ তারিখে
তোমার পূজা করি রে
জয়য়ো রে মনসা দেবী রে।...’
হালিশহরের উপকণ্ঠে প্রায় কয়েক হাজার জেলে পরিবারের বাস। একসময় এই পাড়ার মানুষের পেশা মাছধরা হলেও, শহুরে হাওয়ায় অনেকেই আজ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে পৌরাণিক ও নিজস্ব পালা-পার্বণ নিয়মিতই করেন তারা।
মনসা বন্দনায় বাইশ কবির পদ্মপুরাণ পড়েন তারা, অকপটে কতেক কবির নাম বলে যেতে পারেন শিখা দাস-বীণা দাস যেমন—বেনি মাধব, বিজয়গুপ্ত, প্রণব চন্দ্র দাস, কনক চন্দ্র দাস...। বাইশ কবি রচিত এই পুঁথিতে বাইশ রকমের কবিতার সম্মোহনী সুর বিরাজ করে। এই যে, ঝর্ণা হোরের আঙিনায় দল বসেছে পুঁথি নিয়ে, একজন গায়েন গাইছেন—
ওগো এসো মাগো সরস্বতী,
কণ্ঠে রাখো রে পা,
দোহারবৃন্দ তান ধরেন—
‘শ্রাবণেতে।
ওরে বিদ্যামূলে লিপ্ত করো
সরস্বতী মা,
শ্রাবণেতে।...’
ঝর্ণা হোরের আঙিনায় পুঁথি সম্পন্ন করে সকলে যার যার বাড়ি ফিরে যান। সন্ধ্যায় ক্লাবঘরের আঙিনায় পালটা মনসা। সেখানে যেতে হবে।
এদিকে তৃপ্তি দাস তার পঞ্চমুখী ঘট-এর তৈয়ারি করছেন। পঞ্চমুখের দুই মুখে রাখতে হয় বাঁশপাতা, অন্যগুলোতে বটপাতা, শাপলা ফুল, কচুর ফোপা। এরপর আরাধনার জন্য ঘট বসাতে হয় আসনে। তার সামনে চম্পা কলা, প্রসাদ, আপেল-কমলাসহ নানা ফল, নারকেল, শাড়ি, শঙ্খ, সিঁদুর, চিরুনি দিয়ে ঘটের সামনে আসন সাজানো হয়।
আর বর্ষীয়ান মঞ্জুরি দাসের মনসা পূজা পুরাণের নিয়মে হয়। মঞ্জুরি দাস বলেন, পদ্মপুরাণে বলা আছে—
‘কাঁচা বাঁশ কাইট্টা আনি
বিষহরি বানাই। ...’
এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, জগতে প্রথম ঘট বাঁশ দিয়ে তৈরি ছিল।
মঞ্জুরি দাস মনসা পূজা করার হেতু বলতে গিয়ে জানান, ‘আমার ছেলে সুমন দাস মরে গেছিল, কোলে নিয়ে মনসার বরে লখিন্দর জিয়াইছি। সেই থেকে আমি প্রতি বছর মনসার পূজা করি।’
আষাঢ় মাসে শুরু হয় মঞ্জুরি দাসের মনসার ঘট বসানোর প্রস্তুতি। বাঁশঝাড় থেকে কাঁচা বাঁশ কেটে এনে বসানো হয় মায়ের আসন। বাঁশ, বাসক পাতা, বাটুক পাতা, বটপাতা, অশ্বত্থ পাতা, কচুর ফোপ সহযোগে অধিবাসের দিন সেই বাঁশের ঘটের পেছনে পঞ্চমুখী ঘট বসানো হয়। তার পেছনে মা মনসার প্রতিমা। মঞ্জুরি দাস বলেন, চৌদ্দ ডিঙ্গা ধন আছে মায়ের কাছে। যে যতটা চেয়ে নিতে পারে। নাগ পঞ্চমীর দিন পূজা হয় ঘটা করে। এছাড়া সারা শ্রাবণ মাসের প্রতি রবিবার পূজা হয়।
শ্রাবণ মাসের শেষ দিন শাড়ি দিয়ে মাকে স্বর্গে পাঠাতে হয়। শেষে রাতে আগকুলা, তেল, সিঁদুর, পানের খিলি মায়ের হাতে দিয়ে মাকে বিদায় করতে হয়।
ক্লাবঘরের উঠানে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। সৌরভ দাস ঘোষণা দেন কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে পালটা মনসার গান। আজকে মেঘনাথ সরকার ও শ্যামল শীল পালটা মনসার পুঁথিতে অংশ নেবেন। মেঘনাথ সরকার শিবের পক্ষে আর শ্যামল শীল শ্রোতার পক্ষ নিয়ে পালটা মনসা পুঁথিতে অংশ নেবেন।
মেঘনাথ শুরু করেন—
‘বছরে ছত্রিশ দিনে খুদে খোদা
চামিল পরে দেখ যমুনার পারে,
মানুষ নাম লিখে আর মরে।
এইভাবে দেশ হয়রে স্বাধীন,
বছরে যায়গো বারোদিন,
সুযোগ পাইলে একদিনের নাই ভরসা
মনের কোটা ধরে।
বিয়ে সাদি হইলে পরে
জাতের তালাশ করে।
খেয়াঘাটে গেলে পরে
দুজনে এক নৌকায় চরে।
মেঘনাথ সরকার রমেশ শীলের গান শেষ করে। প্রশ্ন ছুড়ে দেন, বিয়ে সাদিতে জাতপাত জানার প্রয়োজন পড়ে, খেয়াঘাটে কেন পড়ে না?
শ্যামল শীল শুরু করেন, মনসা কর্তৃক চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা ডুবাইবার মন্ত্রণা—
চম্পক নগরে ঘর চাঁদ সদাগর।
মনসা সহিত বাদ করে নিরন্তর
দেবীর কোপেতে তার ছয় পুত্র মরে।
তথাপি দেবতা বলে না মানে তাঁহারে
মনস্তাপ পায় তবু না নোয়ায় মাথা।
বলে চেঙ্গীমুড়ী বেটী কিসের দেবতা
হেতাল লইয়া হস্তে দিবানিশি ফেরে।
মনসার অন্বেষণ করে ঘরে ঘরে
বলে একবার যদি দেখা পাই তার।
মারিব মাথায় বাড়ি না বাঁচিবে আর
আপদ ঘুচিবে মম পাব অব্যাহতি।
পরম কৌতুকে হবে রাজ্যেতে বসতি
এই রূপে কিছুদিন করিয়া যাপন।
বাণিজ্যে চলিল শেষে দক্ষিণ পাটন
শিব শিব বলি যাত্রা করে সদাগর।
মনের কৌতুকে চাপে ডিঙ্গার উপর
বাহ্ বাহ্ বলি ডাক দিল কর্ণধারে।
সাবধান হয়ে যাও জলের উপরে
চাঁদের আদেশ পাইয়া কান্ডারী চলিল।
সাত ডিঙ্গা লয়ে কালিদাহে উত্তরিল
চাঁদ বেনের বিসম্বাদ মনসার সনে।
কালীদহে সাধু দেবী জানিল ধেয়ানে
নেতা লইয়া যুক্তি করে জয় বিষহরী।
মম সনে বাদ করে চাঁদ অধিকারী
নিরন্তর বলে মোরে কানী চেঙ্গীমুড়ী।
বিপাকে উহারে আজি ভরাডুবি করি
তবে যদি মোর পূজা করে সদাগর।
অবিলম্বে ডাকিল শতেক জলধর
হনুমান বলবান পরাত্পর বীর।
কালীদহে কর গিয়ে প্রবল সমীর
পুষ্প পান দিয়া দেবী তার প্রতি বলে
চাঁদ বেনের সাত ডিঙ্গা ডুবাইবে জলে
দেবীর আদেশ পাইয়া কাদম্ববিনী ধায়।
বিপাকে মজিল চাঁদ কেতকাতে গায়
সারারাত চলে পালটা মনসার বাহাস। একজন গান শেষ করে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। অন্যজন আবার সেই প্রশ্নের উত্তর করেন। ভোর হতে হতে পালটা মনসা পুঁথির আসরে ইতি টানেন দুই পালাকার।