প্রামাণ্য উপস্থাপনা

বঙ্গবন্ধুর জীবনে সুর ও ছন্দের ঝংকার

 

মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নিবেদন। গবেষণা ও গ্রন্থনা মফিদুল হক। এটি মূলত একটি এক্সপোজিটারি ও ডিসকার্সিভ মোডের প্রামাণ্যচিত্র। অর্থাত্ এতে বক্তব্য উপস্থাপনের মূলসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ন্যারেশন। তাতে কণ্ঠ দিয়েছেন আমেনা খাতুন। সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রামাণ্য ছবি ও ভিডিও। এমনকি সময়কাল মিলিয়ে যথার্থভাবে ব্যবহূত হয়েছে তিনটি চলচ্চিত্রের ফুটেজ—‘জাগো হুয়া সাভেরা’ (১৯৫৯), ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) ও ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩)। এবং এতে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে তথ্য, উপাত্ত ও ঘটনার বিবরণে। চালচ্চিত্রিক নান্দনিকতা সৃষ্টির চেয়েও। এ ধরনের প্রামাণ্যচিত্রের এটাই বৈশিষ্ট্য।

শুরু করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলা থেকে। সে সময়ে ব্রতচারীগানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। পরে পরিচয় হয় আব্বাসউদ্দীনের গানের সঙ্গে একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘বাংলার জনগণের প্রাণের গান।’ তাঁর সঙ্গে আরো নিবিড় পরিচয় হয় বঙ্গবন্ধুর। শোনেন নৌকায় নদীর বুকে ভাসতে ভাসতে।

১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় কারাবন্দি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেখান থেকেই করেছিলেন অংশগ্রহণ। পরে মে মাসে যান করাচি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে। সেজন্য থাকতে পারেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ আয়োজিত নজরুলজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে। তবে কবির ওপরে একটি প্রবন্ধ লিখে দিয়ে যান। পাঠ করেন মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। পত্রিকায় সে প্রবন্ধের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।

করাচির একটি ঘটনার কথা বঙ্গবন্ধু লিখেছেন আত্মজীবনীতে। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে যাচ্ছিলেন গাড়িতে। ছিলেন আরো কয়েকজন পশ্চিমা অ্যাডভোকেট। তাঁদের বলছিলেন বাংলা ভাষার দাবির কথা। তখন প্রসঙ্গক্রমে বেশ কিছু কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের ‘কে বলে তোমায় ডাকাত বন্ধু’, ‘নারী’ ও ‘সাম্য’ এবং রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি কবিতার অংশ।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জন্য সারা দেশে জনসংযোগ করেন বঙ্গবন্ধু। সে সময় শহীদ সাবেরের লেখা এবং শেখ লুতফর রহমানের সুরে একটি গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ‘ওরে মাঝি তোর বৈঠা ছেড়ে দে’। পরে সত্তরের নির্বাচনের সময় শহীদ সাবের নিজেই জানিয়েছিলেন, গানটি তিনি আসলে লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করেই।

নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। সে উপলক্ষ্যে কার্জন হলে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অংশ নেয় দুই পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিরা। বঙ্গবন্ধু তখন বাণিজ্যমন্ত্রী। গাওয়ার জন্য ডাক পড়ে সন্জীদা খাতুনের। তাঁর কাছে বঙ্গবন্ধু খবর পাঠান। ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়ার জন্য। পাঁচ স্তবকের লম্বা গান। পুরোটা তাঁর মুখস্থ ছিল না। দৌড়ঝাঁপ করে জোগাড় করা হয় গীতবিতান। বঙ্গবন্ধু পশ্চিমের নেতাদের কৌশলে জানিয়ে দেন ‘সোনার বাংলা’ নিয়ে বাঙালির আবেগ কত গাঢ়।

১৯৬২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি হন বঙ্গবন্ধু। ছিলেন ঢাকা জেলের ২৬ সেলে। আরো অনেক রাজনৈতিক কর্মীও বন্দি ছিলেন। অনেকেই ছিলেন বামপন্থি। তাঁরা প্রতি সন্ধ্যায় সমবেত কণ্ঠে গাইতেন ‘বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান’। নেতৃত্ব দিতেন কামাল লোহানী। একদিন খবর এলো, তাঁর স্ত্রী-সন্তানের শরীর ভালো নেই। বিমর্ষ সেই সন্ধ্যায় গান হয়নি। রাত ৮টার দিকে ২৬ সেল থেকে ভেসে আসে বঙ্গবন্ধুর ভরাট কণ্ঠস্বর। ‘এই লোহানী, এই নাসিম, আজ গান করছিস না কেন? গান ধর একটা।’ হতচকিত মুহূর্ত কাটিয়ে সবাই মিলে গান ধরেন, ‘ওরে মাঝি তোর বৈঠা ছেড়ে দে’।

১৯৭১ সালের মার্চ মাস। অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান। একদিন মোহাম্মদ আবদুল জব্বার দেখা করেন কবি ফজল-এ-খোদার সঙ্গে। বলেন বঙ্গবন্ধু একটা গান লিখতে বলেছেন, যাতে উঠে আসবে বাংলার শহিদদের কথা। যে গান শুনলে বাংলার মানুষ পাবে মুক্তির প্রেরণা। তেমন একটি গান ফজল-এ-খোদার লেখাই ছিল। তাতে সুর বসালেন আবদুল জব্বার। তারপর দুজনে মিলে যান ৩২ নম্বরে। রাত ১১টায় দেখা হলো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তাঁকে শোনানো হলো গানটি। তিনি পছন্দ করলেন। ১৫ মার্চ থেকে বাজতে লাগল ঢাকা বেতারে—‘সালাম সালাম হাজার সালাম’।

এই গল্পগুলোর সঙ্গে বাজানো হয়েছে আব্বাসউদ্দীনের ‘আল্লাহ মেঘ দে’, ‘ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া’, কৃষ্ণচন্দ্র দের ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’, সনজীদা খাতুনের ‘আমার সোনার বাংলা’, ইকবাল আহমেদের ‘ওরে মাঝি তোর বৈঠা ছেড়ে দে’ এবং আবদুল জব্বারের ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’-এর অংশবিশেষ। এছাড়াও ব্রতচারীগান ‘বাংলা মার দুর্নিবার আমরা তরুণ দল’ এবং সমবেত কণ্ঠে ‘বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান’। আবৃত্তি আছে নজরুলের ‘কে বলে তোমায় ডাকাত বন্ধু’, ‘নারী’ ও ‘সাম্য’ কবিতার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’, মনোজ বসুর ‘চীন দেখে এলাম’ এবং শেখ লুতফর রহমানের ‘জীবনের গান গাই’ বই থেকে রয়েছে উদ্ধৃতি। বঙ্গবন্ধুর লেখা থেকে পাঠ ও আবৃত্তি করেছেন আসাদুজ্জামান নূর, হাসান আরিফ ও ইকবাল আহমেদ।