‘এর সমাধান না করলে অচিরেই অনেক কৃষিজমি মরুভূমি হবে’
হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী ও আলম সাব্বির
ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ফের পাহাড় ধসের ঘটনার পর ঢলের সঙ্গে নেমে আসা বালিতে ঢাকা পড়েছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কৃষিজমি। রাস্তাঘাট ও ব্রিজ ভেঙে সড়ক যোগাযোগে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার তাহিরপুরে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। স্থানীয়রা জানান, ২০০৪ সাল থেকে প্রতি বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে কিছু না কিছু বালি-পাথর নেমে এসে জমি-বাড়িঘর নষ্ট করে দিচ্ছে। তবে হঠাত্ বড় বিপর্যয় হলেই কেবল খবরের শিরোনাম হয়। এলাকার বিশাল পঁচাশোল হাওর ও সেলাইয়ার হাওরসহ কয়েকটি হাওরের ফসলি জমি বালির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ গ্রামের অন্তত ৪০ হাজার মানুষের জমি, বাড়িঘর হারিয়ে যেতে বসেছে বালির নিচে। ২০০৭ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ে ধসের ঘটনা ঘটলে ঢলের পানির সঙ্গে নেমে আসা বালিতে এলাকার বহু কৃষিজমি মরুভূমিতে পরিণত হয়। অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
রজনী লাইন এলাকার বৃদ্ধ আবুল হোসেন বলেন, ‘ঢলে কৃষি জমি তো গেলই। বালি-পাথর পড়ে জমি ভরাট হয়ে গেছে।’ কৃষি কর্মকর্তা হাসান উদ-দৌলা জানালেন, তারা ক্ষতির পরিমাণ জরিপ করছেন। এর আগে সাড়ে ৩০০ একর জমির ক্ষতি হয়। উত্তর বড়দল ইউপি সদস্য সম্রাট মিয়া বলেন, কয়েক হাজার একর জমি বালির নিচে চলে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হান কবীর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘এলাকার লোকজন মানবেতর জীবনযাপন করছে। বালি-পাথর ভরাট হয়ে কৃষিজমি বিনষ্ট হচ্ছে। শিগিগরই এর প্রতিকার না করলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য নাজির হোসেন বলেন, ‘এর সমাধান না করলে অচিরেই বোরো-আমনসহ কৃষিজমি মরুভূমি হবে।’ তিনি বলেন, আপাতত নেমে আসা ঢলের পানি পরিকল্পিতভাবে নিষ্কাশন করতে হবে। নেমে আসা বালি-পাথর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপসারণ করতে হবে। ঐ এলাকায় বসবাসরত আদিবাসী সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় নেতা এন্ড্রো সলমার বলেন, মেঘালয়ের পাহাড় ধসে গ্রামের অনেক বাড়িঘর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে।
কয়লামিশ্রিত পানিতে অতিরিক্ত সালফার জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর
খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ে রয়েছে অনেক কয়লা খনি। ফলে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বালি, পাথর, কঙ্কর ছাড়াও কয়লার গুঁড়া এসে জমা হচ্ছে যা এলাকার জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। নয়াছড়া, রজনীলাইন, বুরুঙ্গা, লাকমা, ভাঙ্গের ঘাট, বড়ছড়া দিয়ে বর্ষায় বালির সঙ্গে নেমে আসা কয়লামিশ্রিত পানি পার্শ্ববর্তী টাঙ্গুয়ার হাওরসহ মাছের অন্যান্য অভয়াশ্রমের জন্যও যথেষ্ট ক্ষতিকর। বেসরকারি এনজিও সংস্থা বারসিকের পানি বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ জানান, কয়লামিশ্রিত পানিতে অতিরিক্ত সালফার রয়েছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ জেলায় নদী ও হাওরে মাছ ও হাঁসের মড়ক দেখা দেয়। সরকারি হিসাবে তখন সুনামগঞ্জ জেলায় ৪৯ দশমিক ৭৫ টন মাছ মারা যায়। স্থানীয়রা বলেন, এটা ছিল মেঘালয়ের ওপর থেকে নেমে আসা কয়লা ধোয়া পানির প্রভাব। ভারতীয় বিশেষজ্ঞ বেনথি সংলাং বেলাওয়ার ২০১০ সালের জানুয়ারিতে তার একটি গবেষণা পত্রে লিখেছেন, কয়লা খনি থেকে যে অম্ল পানি নামে তা ক্ষতিকর। আর যেখানে কয়লা খনি বেশি সেখানে ক্ষতির পরিমাণও বেশি।
এদিকে রজনী লাইন গ্রামের বয়োবৃদ্ধরা জানান, পাহাড়ের ওপর কয়লার খনির গর্তগুলোতে পানি জমে মাটি ক্রমশ নরম হচ্ছে। তাই ধসের ঘটনা বাড়ছে। জানা যায়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালের ২৪ নভেম্বর ‘মেঘালয়ের পাহাড় ধসের ফলে নির্গত বালি-পাথরে আবাদি জমি নষ্ট ও পরিবেশ বিপর্যয় রোধকল্পে কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়। পাহাড় ধস রুখতে সুনামগঞ্জ ১৭ রাইফেলস ব্যাটালিয়ান এবং ভারতের শিলং ৮৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়ানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ভারতের ফরেস্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী মেঘালয় পাহাড়ে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় খোঁড়া বন্ধের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়। বৈঠকে পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বালি-পাথর এসে গাছপালা লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে এবং ৪৩৯ দশমিক ১৪ একর জমি বালির নিচে চাপা পড়েছে। এখনো এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বৈঠকে বিএসএফর তত্কালীন কমান্ডিং অফিসার মৃদুল স্যানাল মেঘালয়ের কিছু কিছু স্থানে অপরিকল্পিতভাবে খননকাজ চলার কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে বলে স্বীকার করেন।
বেসরকারি সংগঠন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, পরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের পানি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। নতুবা এর বিরূপ প্রভাবে জীববৈচিত্র্যসহ নানা জাতের উদ্ভিদ হারিয়ে যাবে চিরতরে। বর্ষায় মেঘালয়ে পাহাড় ধসের আতঙ্কে থাকেন সীমান্ত খুঁটি ১২০০ এস ৫ সংলগ্ন নয়াছাড়া, রজনী লাইন ও পুরানঘাট গ্রামের বাসিন্দারা।