দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর খুলে দেওয়া হয়েছে পর্যটন কেন্দ্রগুলো। এতে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন সিলেটের দুই শতাধিক হোটেল-মোটেল মলিক। তবে এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখনো সেভাবে পর্যটক আসছেন না সিলেটের স্পটগুলোতে। যদিও গত দুই দিন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রচুর লোকসমাগম ঘটেছে।
চা-বাগান, ঝরনা, জাফলং, রাতারগুল, পাংথুমাই, বিছনাকান্দি, লালাখাল, মায়াবন, টাঙ্গুয়া, হাকালুকি, হাওর বিলাসসহ অস্যংখ্য পর্যটন স্পট রয়েছে সিলেটে। করোনার আগে এসব স্পটে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। প্রতি বছর ৪ লাখের বেশি পর্যটকের আনাগোনা হতো সিলেটের স্পটগুলোতে। দীর্ঘদিন এসব কেন্দ্র বন্ধ থাকায় এই খাতে বিনিয়োগকারী ও কর্মীরা বিপাকে পড়েন। এখন তাদের মুখে কিছুটা হাসি ফুটেছে। কিন্তু এখনো সিলেট সীমান্তঘেঁষা সাদা পাথর, বিছনাকান্দি, জাফলংসহ কিছু স্পটে তেমন সাড়া মেলেনি।
প্রতি বর্ষায় সিলেটের রূপ দেখতে পর্যটকেরা ভিড় করতেন এই জেলার বিভিন্ন পর্যটন স্পটে। শুক্রবার ময়মনসিংহ থেকে আট বন্ধুর একটি দল এসেছিল সিলেটে বর্ষার রূপ দেখতে। সাদা পাথর, বিছনাকান্দি, রাতারগুল ও ছাতক ঘুরে দলের সবাই তৃপ্তি প্রকাশ করেছেন। তাঁরা জানান, পর্যটন স্পটগুলোতে এখনো লোকসমাগম ঘটেনি। নগরীর আম্বরখানা এলাকার এক বাসিন্দ বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর মনে হচ্ছে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলাম।’ সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্রে গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন মায়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল ব্যবসা। পর্যটক না এলে আমাদের ব্যবসা নাই। এখন পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ায় কিছুটা হলেও জানে বাঁচা সম্ভব হবে।’
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে জরিমানা গুনতে হবে। নিষেধাজ্ঞা উঠলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পর্যটকদের আসতে হবে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। সিলেটের জাফলং, শ্রীপুর, বিছনাকান্দিসহ বেশ কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রে কঠোর স্বাস্থ্যবিধির কথা জানালেন গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তাহমিলুর রহমান।
বিভাগের অন্যতম আকর্ষণীয় স্পট শ্রীমঙ্গল। শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক ও গ্রিনলিফ গেস্ট হাউজের পরিচালক এস কে দাশ সুমন বলেন, ‘করোনার কারণে শ্রীমঙ্গলের শুধু বড় উদ্যোক্তারাই নন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। আশা করি আস্তে আস্তে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। তবে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আসতে হবে।’
ঘুরে দাঁড়াতে প্রয়োজন প্রণোদনা
সিলেটের খাদিমনগর ও লালাখাল এলাকায় নাজিমগড় রিসোর্টের দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নাজিমগড় রিসোর্টের এমডি নাজিম কামরান চৌধুরী বলেন, সরকারি ছুটি না থাকলে মানুষ ঘুরতে আসে না। তাছাড়া মানুষের হতে টাকা নেই। প্রায় ১৮ মাস ধরে লকডাউন। দুই প্রতিষ্ঠানে সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ মানুষ। মাসে বেতন ৩৫ লাখ টাকার ওপরে। এমন অবস্থায় দীর্ঘ লকডাউনে ঋণের বোঝা বেড়েছে। মাঝখানে মাত্র তিন মাস ব্যবসা করার সুযোগ হয়। আর এখন আবার খুলেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও সঠিকভাবে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন সরকার থেকে প্রণোদনা হিসেবে বিনা সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করলে অন্তত টিকে থাকা যাবে।
লোকসান হাজার কোটি টাকা
সিলেট বিভাগীয় হোটেল ও গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি সুমাত নুরী জুয়েল বলেন, হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতিদিন সিলেট বিভাগে পর্যটন খাতে অন্তত ৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। সে হিসাবে এখন ক্ষতির পরিমাণ কম হলেও হাজার কোটি টাকার বেশি। পর্যটনকেন্দ্র খুললেও অতীতের লোকসান পুষিয়ে নেওয়া কঠিন।
সিলেটের ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে পর্যটন খাতে সরকার থেকে দীর্ঘমেয়াদি বরাদ্দ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার গুরুত্বারোপ করেছেন সিলেট চেম্বারের সভাপতি এ টি এম শোয়েবও। পর্যটন খাতে থোক বরাদ্দের দাবি জানিয়ে চেম্বার সভাপতি বলেন, গাড়িচালক থেকে চা-পানবিক্রেতা সবাই পর্যটন খাতের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই এ খাতের জন্য থোক বরাদ্দ জরুরি।