ঢাকা শহরে কোনো ভবন বা গুদামে আগুন লাগলেই নানা আলোচনা শুরু হয়। ভবনটির বিল্ডিং কোড মানা হয়েছিল কি না কিংবা ভবনের মধ্যে কী পরিমাণ কেমিকেল ছিল কিংবা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসকে কতটা বেগ পেতে হয়েছে ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য পায় আলোচনায়। আলোচনা চলে বেশ কয়েক দিন; এরপর থেমে যায় সবকিছু। আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে প্রতিবারই একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এই কমিটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর প্রতিবেদনও দেয়। কিন্তু প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো কখনই বাস্তবায়ন করা হয় না। বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের কোনো আগ্রহও নেই।
সর্বশেষ গতকাল বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার ছয়তলা ভবনে আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, বিল্ডিং কোড না মানলে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না। তিনি জানিয়েছেন, এই বিল্ডিংটা অনেক পুরোনো। এই ভবনগুলোকেও আধুনিক করতে হবে।
তবে রাজধানীতে ক্ষয়ক্ষতির দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটেছে পুরান ঢাকায়। জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় রাসায়নিকের ১ হাজার ৯২৪টি পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। রাসায়নিক রাখা এসব স্থাপনা বা গুদামের সবই কম বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় গত ডিসেম্বরে দক্ষিণ সিটি, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা মিলে একটি জরিপ করেন। গত মার্চে এই কমিটি রিপোর্টও জমা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাসায়নিক গুদাম ও এর ঝুঁকির বিষয়টি সবারই জানা। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে গত ২৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার আরমানিটোলার হাজি মুসা ম্যানশন নামের একটি ভবনে রাসায়নিকের গুদামে আগুন লেগে ছয়জনের মৃত্যু হয়। জরিপে উঠে আসে, ১ হাজার ৯২৪টি গুদামের ৯৮ শতাংশে ঝুঁকির মাত্রা মধ্যম পর্যায়ের। দেড় শতাংশে ঝুঁকির মাত্রা কম। আর বাকি আধা শতাংশ অতি ঝুঁকিপূর্ণ। অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ৩৬টি রাসায়নিক যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মজুত ও বিক্রি করা হয়, সেসব গুদাম বা দোকানকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখা হয়। আরমানিটোলার যে ভবনে আগুন লাগে, সেখানে রাসায়নিকের মজুত ছিল। সেগুলো পুড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া তৈরি হয়। চিকিত্সকেরা বলেছেন, মুসা ম্যানশনের ঘটনায় ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে মূলত ধোঁয়ার কারণে।
গতকাল বনানীর যে ভবনটিতে আগুন লেগেছিল সেখানেও প্রচুর ধোঁয়া দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ভবটিতে এমন সব জিনিস ছিল যেগুলো দাহ্য জাতীয় পদার্থ। প্লাস্টিক বা কেমিক্যাল জাতীয় বস্তু। ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো ভবনে যদি দাহ্য পদার্থ থাকে সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কষ্ট করতে হয়। পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডে এটা বেশি হয়।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাসায়নিক ব্যবসার জন্য নতুন ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া ও লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। সিটি করপোরেশন বলছে, ২০১৯ সালের পর আর কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। এমনকি আগের লাইসেন্সও নবায়ন করা হয়নি। কিন্তু ব্যবসা ঠিকই চলছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈধ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অসংখ্য অবৈধ প্রতিষ্ঠানও পুরান ঢাকায় ব্যবসা করছে। তারা গোপনে বিপজ্জনক ও দাহ্য পদার্থ মজুত ও বিক্রি করে।
পুরান ঢাকার বাসিন্দারা জানান, সেখানে রাসায়নিকের বেশির ভাগ দোকান ও গুদাম আবাসিক ভবনে। রাসায়নিকের কোনটি বিপজ্জনক, কোনগুলো দাহ্য, তা ভবনের বাসিন্দাদের জানার উপায় নেই।
এ বিষয়ে রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ কেমিকেল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা এনায়েত হোসেন বলেন, বেশি মুনাফার আশায় অনেকেই বিপজ্জনক রাসায়নিক বিক্রি করে থাকেন। তারা ব্যবসায়ী সংগঠনের তোয়াক্কা করেন না।
ইত্তেফাক/কেকে