অবাক পৃথিবী : পুতুল দ্বীপ

 

প্রায় ১০০ বছর আগের কথা। তিন মেক্সিকান শিশু খেলা করছিল গাছে ঢাকা, অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জন একটি দ্বীপে। খেলছিল পুতুলখেলা। পুতুলের বিয়ে দিচ্ছিল তারা। হঠাত্ই তিনজনের মধ্যে একজন নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় দ্বীপের পাশে পরিত্যক্ত একটি খালে। তবে জীবিত নয়; মৃত অবস্থায়। এরপর থেকেই ভয়ে আর কেউ ঐ দ্বীপের ত্রিসীমানা মাড়ানোর সাহস করত না। কিছুকাল পরে দেখা গেল দ্বীপটির গাছপালার ডালে, পরিত্যক্ত ঘরবাড়ির দেওয়ালে সর্বত্রই ঝুলে আছে পুতুল আর পুতুল। সাধারণ নয়; বীভত্স, ভয়ংকর সব পুতুল। কারো হাত নেই, কারো পা নেই। কারো মাথা, চেহারা ছেঁড়া-ফাটা।

স্থানীয়দের ভাষায় ইলসা ডে লাস মিউনিকাস বা পুতুলের দ্বীপ। মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটি থেকে ১৭-১৮ মাইল দক্ষিণে জোকিমিলকো-তে এর অবস্থান। পুতুলের বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ১৯৯০ সালে। তখন মেক্সিকো সরকার বন-জঙ্গলগুলো পরিষ্কার করে দ্বীপটিকে ন্যাশনাল হেরিটেজ ঘোষণা করে এবং পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উন্মুক্ত করার চেষ্টা করে।

কিন্তু এই দ্বীপে এত পুতুল এলো কীভাবে? এ নিয়ে অনেক কিংবদন্তি আছে। অনেকেই মনে করেন ঐ শিশুটি মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর ডন জুলিয়ান সানতানা নামের এক যাজক তপস্যা করতে আসেন এই দ্বীপে। জুলিয়ান দ্বীপটিতে আশ্রম গড়ে তোলার পর মৃত শিশুটির আত্মা প্রায়ই তার সঙ্গে কথা বলত। জুলিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির আত্মা নাকি তার কাছে পুতুলের বায়না ধরে। যেমন তেমন পুতুল নয়। বীভত্স সব পুতুল হতে হবে। পুতুলগুলো দেখলে যেন মনে হয় তারা মানুষের নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছে। এ কারণে জুলিয়ান তাঁর আশ্রমে চাষ করা সবজির বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে নষ্ট পুতুল সংগ্রহ করতে থাকেন। নষ্ট পুতুল এনে দ্বীপের চারপাশে টাঙিয়ে দিলে নাকি শিশুটির আত্মা খুশি হতো। কুড়িয়ে পাওয়া কিংবা কিনে আনা হাজার হাজার নষ্ট পুতুল দিয়েই জুলিয়ান গড়ে তোলেন পুতুলের দ্বীপ। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন দ্বীপটিতে এখনো মৃত শিশুটির আত্মা ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে শোনা যায় তাদের ভুতুড়ে আওয়াজ। এইসব পুতুল ঘিরেও নানান ভৌতিক কাহিনি রচনা করেছে স্থানীয়রা। তাদের কথায়, রাতের অন্ধকারে নাকি পুতুলরা জীবন্ত হয়ে ওঠে, তারা ফিসফিস করে কথা বলে নিজেদের মধ্যে! লোককাহিনি আছে যে, পুতুলগুলোর বিচ্ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অংশবিশেষ, বিশেষত মাথা-হাত-পা নাকি মাঝে মাঝে নড়াচড়া করতে দেখা যায়। অনেক সময় পুতুলগুলোর চোখ খুলতে ও বন্ধ করতেও কেউ কেউ দেখেছে বলে জাহির করে। দীর্ঘ সময় ধরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পুতুলগুলোর চেহারাই ভুতুড়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে পুতুলগুলোর বিচ্ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, শূন্যদৃষ্টিযুক্ত মস্তক যা হলিউডের ভয়ংকর সব মুভির কথা মনে করিয়ে দেয়!

পর্যটকরা কদাকার পুতুল দেখে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে—এই অজুহাতে এখানে আসতে ভয় পান তাঁরা। ফলে দ্বীপটি টুরিস্ট পয়েন্ট হিসাবে জমজমাট হয়ে উঠতে পারেনি। তবে অনেক আগেই ইউনেস্কো ইলসা ডে লাস মিউনিকাসকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছে। সর্বশেষ, ২০০১ সালের ২১ এপ্রিল এখানে ঘটে আরো একটি রহস্যময় ঘটনা। ঐদিন ডন জুলিয়ান তাঁর ভাইপোকে নিয়ে খালটিতে মাছ ধরছিলেন, যে খালে শিশুটির মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। মাছ ধরার এক পর্যায়ে ডন জুলিয়ান তাঁর ভাইয়ের ছেলেকে বলেন, ‘পানির নিচ থেকে আমাকে কারা যেন ডাকছে। তাদের কাছে যাওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করছে।’ এর কিছুদিন পরই ডন জুলিয়ানের মৃতদেহ সেই খালে ভেসে ওঠে।

শাকিরুল আলম শাকিল