ভিডিও গেম ‘সিক্স ডেজ ইন ফালুজা’ বাজারে ছাড়ার পর থেকেই এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এতে এক জন গেমার ফার্স্ট পারসন শুটার হিসেবে একলা অথবা কয়েক জন মিলে অংশ নিতে পারেন। ইরাক যুদ্ধ নিয়ে তৈরি এটিই প্রথম ভিডিও গেম। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের ১৮ বছর পূর্তির কয়েক দিন পর ভিডিও গেমটি রিলিজ হয়।
ইরাকে মার্কিন সৈন্যরা যেসব অপারেশন চালায় তার মধ্যে সব চেয়ে রক্তক্ষয়ী ছিল অপারেশন ফ্যানটম ফিউরি (ফাল্লুজার দ্বিতীয় যুদ্ধ)। ২০০৪ সালের শেষ দিকে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ মিশন অ্যাকমপ্লিশড ভাষণের অল্প দিন পরই অভিযানটি চালান হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভিক্টুরা এবং হাইওয়্যার গেমস গেমটি তৈরি করে। এটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরাকের সাধারণ মানুষকে যেমন তেমনি যুদ্ধে অংশ নেওয়া বিদেশি সৈন্যদের অনেককে ক্ষুব্ধ করেছে। যুদ্ধ ইরাকিদের জন্য কোনো ছেলেখেলা নয়, এটি তাদের জীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এককালের সভ্যতার পীঠস্থান পরিণত হয়েছে ভয়াল মৃত্যুপুরীতে। বিদেশি সৈন্যদের মধ্যেও বহু হতাহত হয়েছে।
সিক্স ডেজ ইন ফালুজায় একজন গেমারকে মার্কিন মেরিন সেনাদের সঙ্গী হয়ে ইরাকি ইনসার্জেন্ট বা সশস্ত্র যোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে হয়। লক্ষ্য থাকবে ফাল্লুজা বিদ্রোহী মুক্ত করা।
ফাল্লুজার দ্বিতীয় যুদ্ধে মার্কিন হিসেবেই ৮০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের ১০০ সৈন্য মারা গেছেন। পুরো ইরাক যুদ্ধের মধ্যে ফাল্লুজা অপারেশন ইরাকিদের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। ভয়াবহ সেই মানসিক যন্ত্রণার স্মৃতি উসকে দিয়েছে এই গেম। মার্কিন সেনারা নিজেরাই করেছে ঐ অপারেশন, তাদের হাতে বহু নারী ও শিশু নিহত হয়েছে। গেমটি ২০০৯ সালে প্রথম তৈরি করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় বিতর্ক তৈরি হওয়ায় গেমটি তখন বাজারে আসেনি। জাপানের কোনামি হোল্ডিং করপোরেশন সেটি তৈরি করে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া সৈন্য, রাজনীতিক এবং গেমারদের কাছ থেকে আপত্তি আসার পর তারা সেটি প্রত্যাহার করে নেয়। গেমটির মাস্টারমাইন্ড ভিক্টুরার সিইও পিটার টামটে বলেছেন, নতুন সংস্করণটি আগের সংস্করণ থেকে ভিন্ন। গেমের এবারের সংস্করণে ইতিহাসের ঐ সময়টুকুতে মার্কিন বাহিনীর ‘ত্যাগ ও সাহসিকতা’ তুলে ধরা হয়েছে। গেম তৈরির সময় ২৬ জন ইরাকের সাধারণ মানুষের সাক্ষাত্কার নেওয়া হলেও কোনো ইরাকি ডেভেলপার নেওয়া হয়নি।
মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য মতে, ফাল্লুজা অপারেশনের আগে সেখানে লিফলেট ছড়িয়ে নারী ও শিশুদের শহরের বাইরে চলে যেতে বলা হয়েছিল। ১৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সি পুরুষরা যেন শহরের বাইরে যেতে না পারে সেজন্য ব্যারিকেড বসান হয়। তারা মনে করত ফাল্লুজার পরিণত বয়সি বেশির ভাগ পুরুষ সশস্ত্র গেরিলা গ্রুপের সদস্য। বাস্তবতা হলো ঐ যুদ্ধে যত সংখ্যক নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছে তা ইরাক যুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। এই যুদ্ধে মার্কিন মেরিন সেনারা সাদা ফসফরাস ব্যবহার করে। এটি একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক, যা যুদ্ধে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। বিষয়টি তারা প্রথম দিকে অস্বীকার করলেও পরে গেরিলাদের বিতাড়িত করতে এই রাসায়নিক ব্যবহারের কথা স্বীকার করে। এজন্য দেখা গেছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক বছর পর পর্যন্ত সেখানে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে শিশুদের জন্ম নিতে দেখা গেছে। নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনী যুদ্ধাপরাধ করেছে বলেও অনেকে মনে করেন। গেমে রাসায়নিকসহ অন্যান্য বীভত্ষতা তুলে ধরা হয়নি। ফলে বিদেশি সৈন্যদের অপরাধ গেমের মধ্যে চাপা পড়ে গেছে। এভাবে হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাসের সত্য। সাধারণ মানুষের কাছে তখন গেমই প্রকৃত বলে প্রতিভাত হবে। কারণ ভার্চুয়াল রিয়ালিটি অনেক সময় প্রকৃত রিয়ালিটিকে ছাপিয়ে যায়।