‘নজরুলের অনেক গান হারিয়ে যাচ্ছে’

নজ­রুল সংগীতের সঙ্গে কয়েক দশক পার করলেন সংগীতশিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। ২০১৫ সালে নজরুল পদক অর্জনের পর থেকেই নজরুল সংগীতের প্রসারে চালু করেন জেমস অব নজরুল নামের একটি সংগঠন। নজরুল প্রয়াণ দিবসে তার ব্যস্ততা, জেমস অব নজরুলের পরিকল্পনা ও সংগীত চর্চার নানা দিক নিয়ে তিনি কথা বললেন ইত্তেফাকের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন

এ এম রুবেল

নজরুল প্রয়াণ দিবসের ব্যস্ততা নিয়ে জানতে চাই—

করোনার কারণে তো বড় পরিসরে আয়োজন করা চাইলেও সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও ‘জেমস অব নজরুল’ থেকে ‘সংঘ বাঁধিয়া চলি’ শিরোনামের একটি গান মিউজিক ভিডিও আকারে প্রকাশ করছি। এছাড়া বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবো।

জেমস অব নজরুল-এর পরবর্তী পরিকল্পনায় কী থাকছে?

নজরুলের গান সেভাবে উঠে আসছে না। অনেক গান হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে নজরুলের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়ার পাশাপাশি এ প্রজন্মের কাছে নজরুলের গানকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলা। সেই লক্ষ্যে নিয়মিত তার গান মিউজিক ভিডিও রিলিজের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

নজরুল সংগীত হারিয়ে যাওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?

আসলে নজরুল সংগীত রাগ নির্ভর ও বিভিন্ন তালের ব্যবহার হওয়ার কারণে অনেক কঠিন। প্রপার শিক্ষা না থাকলে এই গান গেয়ে সেই লেভেলে পৌঁছানো সম্ভব না। তাছাড়া এই গানের পৃষ্ঠপোষকতাও অনেক কম রয়েছে।

তাহলে কী বলতে চাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুল সংগীত অনেক দুর্বোধ্য?

ঠিক দুর্বোধ্য নয়, দুর্বোধ্য করে রাখা হয়েছে। এখন সবাই কম সময়ে তারকা হতে চায়। ধৈর্য্য কমে গেছে। এক সময় আমরাও তো নতুন ছিলাম, অনেকের কাছে গান শিখেছি। কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা সেই প্রশিক্ষণ পাচ্ছে না। যদি এই প্রশিক্ষণের সুযোগ তাদের তৈরি করে দেওয়া য়ায় তাহলে তারা অনেক ভালো করবে।

বিশেষ দিবস ছাড়া নজরুল সংগীতের অনুষ্ঠান আয়োজিত না হওয়ায় নতুনদের অনিহা আরো বাড়ছে কি-না?

হ্যাঁ, অবশ্যই বাড়ছে। তাদের আগ্রহ বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এই গানের চর্চা যত বাড়বে তত তারা আকৃষ্ট হবে। বেশি অনুষ্ঠান আয়োজিত হলে নতুনরা দেখে অনেককিছু শিখতেও পারতো।

নজরুল সংগীতকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার পরিবেশ কী আমাদের দেশে রয়েছে?

দেখুন, শুধু নজরুল সংগীত না, পুরো সংগীত ইন্ডাস্ট্রিই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। দিনদিন মিউজিশিয়ানের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তবে ট্যালেন্ট হান্টের মাধ্যমে প্রতিভাবান শিল্পী বের করে যদি তাদের যত্ন নেওয়া যায় তাহলে নিশ্চয় ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।

আপনি নতুন-পুরনো অনেকের সঙ্গে কাজ করছেন। এ প্রজন্মের কার ভেতরে সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন?

বর্তমানে অনেক তরুণ শিল্পীই ভালো কাজ করছেন। বিজন, সূচি, প্রিয়াঙ্কা, স্বরলিপি, বর্ণালি, মৃদুলা, পলাশ, মাহমুদুল, তানভীরসহ অনেক মেধাবী আছে, যারা খুব ভালো কাজ করছে।

অনেক নজরুল-রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অভিযোগ করেন যে, তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়। এ নিয়ে আপনি কী মন্তব্য করবেন?

হ্যাঁ, এ কথা সত্য। এর জন্য প্রডিউসার-প্রযোজকরা দায়ী। এখন প্রপার লোক দিয়ে মিডিয়া হাউজগুলো চলছে না। যে কারণে অনেক গুণী শিল্পী তাদের প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আপনি প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগমের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তার কোন দিকগুলো আপনাকে ভাবায়?

ফিরোজা বেগমের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে। এরপর ওনার পরিচালনায় কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নিই। ১৯৯০ সালে উনি হঠাত্ আমাকে আমেরিকায় অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার অফার করলেন। এরপর টানা তিন মাস ওনার সঙ্গে আমেরিকায় অনুষ্ঠান করলাম। উনি যে কত বড়মাপের মানুষ সেটা তখন আরো বুঝতে পারলাম। তিনি কীভাবে পারফর্ম করেন, কতটা পরিশ্রম করতে পারেন, মানুষ কতটা সম্মান করেন, দেখতে পেলাম। আমার প্রথম অ্যালবামও তিনি পরিচালনায় করেছিলেন। এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া ছিল।

ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কারও পেয়েছেন। এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শ্রেষ্ঠ কাজটি কী করে ফেলেছেন মনে করেন?

শেষ্ঠ কাজ তো বাকি থাকে সামনে! আরো একটু ভালো কাজ করার ইচ্ছে সবসময়ই থাকে। করে ফেলেছি বললে তো কাজ এগিয়ে যাবে না। আমি সবসময়ই ভাবি কেবল শুরু করছি।