বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি হইলেও মানুষের তুলনায় আয়তন অত্যন্ত কম। রাজধানী ঢাকার অবস্থা তো আরো খারাপ। এইখানে ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটাচলার সময় একে-অন্যের সহিত ধাক্কা না লাগাটাই অস্বাভাবিক। সেইখানে সকল শ্রেণিরই মানুষ রহিয়াছে। একটি ছোট্ট হিসাব বুঝিয়া লওয়া যাক। স্বাধীনতার ৫০ বত্সরে দেশটিতে ১১ বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে। অনেকেই একাধিকবার নির্বাচিত হইয়াছেন। আবার অনেকেরই সংসদ সদস্য হইবার কপাল খুলিয়াছে মাত্র একবারই। গড়ে দেখা যাইবে বর্তমানে জীবিত সাংসদের সংখ্যা দেড়-দুই হাজার। অপরদিকে জীবিত সকল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীর সংখ্যা হইবে অর্ধসহস্রাধিক। পৌরসভাগুলির সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান-মেম্বার কিংবা অধুনা সিটি করপোরেশনের মেয়র কাউন্সিলারের সংখ্যার তো শেষ নাই। ইহারা সকলেই ক্ষমতাবান। অন্যদিকে বর্তমানে দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা ১২ লক্ষাধিক। কেবল সচিবালয়েই কর্মকর্তা রহিয়াছেন ৫ সহস্রাধিক। ইতিপূর্বে, বিগত ৫০ বত্সরে কত শত-সহস্র-অযুতসংখ্যক কর্মকর্তারা অবসরে গিয়াছেন, সেই সংখ্যাটিও কিন্তু হেলাফেলার নহে। অর্থাত্ সরকারে বা প্রশাসনে যাহারা এখন ক্ষমতায় বা দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহাদের বাহিরেও গত ৫০ বত্সরে অনেক অধিকসংখ্যক মানুষ মন্ত্রী-উপমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সচিব-উপসচিব ছিলেন। এই মানুষগুলি অভিজ্ঞ, ইহারা কিন্তু সকলেই প্রশাসন কিংবা সরকার খুব ভালো বুঝেন। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ইহা বলাই যায় যে, সরকারের যাহারা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে ছিলেন এবং বর্তমানে রহিয়াছেন—এমন মানুষের সংখ্যা এখন এতটাই অধিক যে, কেহ কেহ মনে করেন—ঢাকার রাস্তায় হাঁটিতে গেলে উহাদের একে-অন্যের সহিত গায়ে ধাক্কাও লাগিতে পারে। সুতরাং কাহারো মনে করিবার কারণ নাই, আমিই অধিক ক্ষমতাশালী এবং অধিক জ্ঞানী।
ইহা ছাড়াও বর্তমানে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বিপুল হারে বাড়িয়াছে। একসময় আমরা শিক্ষিত বলিতে কেবল স্বাক্ষর করিবার ক্ষমতাটুকুকেই বুঝিতাম। এখন পরিস্থিতি পালটাইয়াছে। এই ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে মাত্র ৫ হাজার মুসলমান পরীক্ষার্থী ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে। মনে রাখিতে হইবে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তখন ছিল সমগ্র বঙ্গদেশ ও আসাম। আর এখন, কেবল বাংলাদেশেই ম্যাট্রিক সমমানের এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লক্ষের কাছাকাছি। অর্থাত্ এই দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে চার শত গুণের অধিক! স্পষ্টতই, মানুষকে এখন আর অজ্ঞ মনে করিবার কোনো কারণ নাই। রাস্তায় যাহার সহিত ধাক্কা লাগিবে, তিনিও একসময় সরকারে ছিলেন, প্রশাসনে ছিলেন। এবং যাহারা সহিত ধাক্কা লাগিয়া ঝামেলা শুরু হইল, তিনিও একসময় অবসরে যাইবেন। সুতরাং কথাবার্তা বলিতে হইবে সাবধানে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল—বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই অধিক। ইহাকে বলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। এই তরুণদের মধ্যে শিক্ষিতের সংখ্যাও হেলাফেলার নহে। তাহাদের কিন্তু চোখকান বন্ধ নাই। সুতরাং যিনি যেইখানে যেই পদেই থাকুন না কেন—গায়ের জোরে তাহার যাহা খুশি বলিবার কোনো সুযোগ নাই।
একটি কথা এখন প্রায়শই বাতাসে শুনা যায় যে, এখন নাকি রাজনীতি নাই! কিন্তু সত্যিই কি রাজনীতি নাই? মনে রাখিতে হইবে, প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কোনো স্থান শূন্য হইয়া গেলে মুহূর্তেই উহা কিছু না কিছু দ্বারা পূর্ণ হইয়া যাইবেই। সুতরাং রাজনীতিতেও এক নূতন ধরন আসিতেছে। সেই সঙ্গে মানুষ রাজনীতি-সচেতনও হইয়াছে অনেক অধিক। এই অবস্থায় মুখ সামলাইয়া কথা না বলিলে তাহার জন্য অনেক অধিক মূল্য চুকাইতে হইবে। আমরা যাহারা লিখি বা লিখি না, যাহারা অধিক কথা বলি কিংবা চুপচাপ থাকি—সকলকেই সতর্ক হইতে হইবে। যাহারা নিজেদের জ্ঞানী-গুণী-মানি মনে করেন, তাহারা যেন সক্রেটিসের দর্শনকথা ভুলিয়া না যান যে, তিনিই জ্ঞানী যিনি তাহার অজ্ঞতার ‘রকম ও পরিমাণ’ জানেন। আমরা আরো স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারি—জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যিনি তাহার অজ্ঞতাকে ঢাকিয়া রাখিতে জানেন। সুতরাং কথা অল্প বলিতে হইবে, টু দ্য পয়েন্ট বলিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, গোঁজামিল দিয়া দেশ চলে না, জীবনও চলে না।