নানা জটিলতায় বন্ধ হতে চলেছে মধ্যপাড়া পাথরখনির কর্মকাণ্ড। এর ফলে ৭০০ শ্রমিক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাথর উত্তলন কার্যক্রম বন্ধ হলে বিপাকে পড়বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, পায়রা, মাতারবাড়ি, শহাজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলো। কারণ এখান থেকে প্রকল্পগুলোর পাথর জোগান দেওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, পেট্রোবাংলা ও মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) সঙ্গে যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট এই পাথরখনি নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। খনিটি তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে তুলে দিতে মরিয়া চক্রটি। এ কারণেই টানা তিন মেয়াদে লাভজনক খনি থেকে পাথর উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। সময়ক্ষেপণ করে বড় ধরনের সংকট তৈরি করে ফায়দা হাসিল করতে চায় ঐ চক্র।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ১৯৭৩-১৯৭৫ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মধ্যপাড়া এলাকায় ১২৮ মিটার গভীরতায় কঠিন শিলা আবিষ্কার করে। উত্তর কোরিয়ার মেসার্স কোরিয়া সাউথ কো-অপারেশন করপোরেশনের সঙ্গে পাথরখনি উন্নয়নে ১৯৯৪ সালের মার্চে মূল চুক্তি হয়। কয়েক দফা ব্যয় বৃদ্ধির পর ২০০৭ সালের ২৫ মে পাথরখনির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পাথর উত্তোলন কাজ শুরু হয়। কিন্তু লোকসান হচ্ছিল। একপর্যায়ে খনিটি ৫০০ কোটি টাকার বেশি লোকসানের বোঝা নিয়ে এটি বন্ধের উপক্রম হয়।
খনিটিকে সচল রাখতে জার্মানিয়া স্ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) এবং মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) মধ্যে চুক্তি হয়। ২০১৩ সালে ২ সেপ্টেম্বর ছয় বছর মেয়াদি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়। ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পাথর উত্পাদন শুরু হয়। নানা বাধা পেরিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রথম লাভের মুখ দেখে। ঐ অর্থবছরে প্রায় ৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা লাভ হয়। এরপর থেকে মুনাফা অব্যাহত আছে।
মেয়াদ শেষ হলেও রহস্যজনক কারণে মধ্যপাড়া পাথরখনির ঠিকাদার নিয়োগে কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। বর্তমানে এই খনি থেকে পাথর উত্তোলন করছে বেলারুশের কোম্পানি জার্মানি স্ট্রেস কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। আগামী ২ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সেক্ষেত্রে হাতে আছে মাত্র ১০ দিন। এ অবস্থায় বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের একমাত্র পাথরখনির কার্যক্রম। অন্যদিকে খনি বন্ধ হলে বেকার হবেন ৭০০র বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী। একই কারণে বন্ধ হয়ে গেছে পার্শ্ববর্তী বড় পুকুরিয়া কয়লাখনিও। গত ১০ আগস্ট খনিটির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান চীনা সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়াম চলে গেছে। এখানেও বেকার হয়ে পড়েছেন দুই-তৃতীয়াংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, মধ্যপাড়া পাথরখনির চুক্তি নিয়ে কাজ চলমান। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এটি চূড়ান্ত হয়ে যাবে। কাজ যাতে বন্ধ না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, এই খনির ঠিকাদার নিয়োগে ৭ দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে বিদেশিদের সাড়া মেলেনি। এ অবস্থায় আগামী ২ সেপ্টেম্বরের আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, আগামী ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না হলে খনিটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ বেআইনিভাবে বিদেশিরা এখানে কাজ করবে না। বর্তমানে শতাধিক বিদেশি খনি বিশেষজ্ঞ ও অর্ধশত দেশি প্রকৌশলী এবং সাড়ে ৭০০ শ্রমিক বর্তমানে এখানে কাজ করছে।