শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের রংপুর-দিনাজপুর সার্কেলের কয়েক জন সরকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দিনাজপুর সার্কেলে কর্মরত নীলফামারী জেলার সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহেরের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ, কার্যাদেশের দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রোগ্রেস দেখিয়ে বিল ছাড় করেন তিনি। গত ১৬ আগস্ট এ ধরনের একাধিক অভিযোগে রংপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে শুনানিও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির শুনানিতে আলোকপাত করা হয়, আবু তাহের স্বাক্ষরিত প্রোগ্রেস রিপোর্ট অনুযায়ী কিশোরগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের কার্যাদেশ ২৪-০৬-২০২১ তারিখে দেওয়া হলেও কার্যাদেশের মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে ৪৫ শতাংশ প্রোগ্রেস দেখিয়ে ঐ কাজে ৬৫ লাখ টাকা বিল ছাড় করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মেসার্স কারিব এন্টারপ্রাইজের নামে এই কাজ সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের নিজেই করার বিষয়েও শুনানি হয়। এছাড়া জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের কার্যাদেশ ২৭-০৬-২১ তারিখে দেওয়া হলেও দুই দিনের ব্যবধানে ২৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৩০ জুন তারিখে ৩১ লাখ টাকা বিল প্রদান করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের শুনানিতে আনা হয়, নীলফামারীর সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের নিজে ও তার দুই ভাই ডোমার উপজেলার আটিয়াবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলম ও সহকারী শিক্ষক কালামকে দিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করে জোরপূর্বক অনেক ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজ নিয়ে নামকাওয়াস্তে কাজ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তদন্ত কমিটির কাছে এর প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা ৩০০০ স্কুল প্রকল্পের আওতায় সৈয়দপুরের সাতপাই উচ্চবিদ্যালয়, আইসিটি কলেজ প্রকল্পের আওতায় ডোমার মহিলা কলেজ ও নীলফামারী মডেল কলেজ (সৈকত এন্টারপ্রাইজ নামে প্রক্রিয়াধীন), সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ডিমলার জটুয়াখাতা উচ্চবিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জের কিশোরীগঞ্জ মডেল উচ্চবিদ্যালয়, ৭০১৬ প্রকল্পের আওতায় উত্তর ডোমারের ভোগডাবুড়ি উচ্চবিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জের মাগুড়া কলেজ, জলঢাকার চ্যারেঙ্গা ঝাড়বাড়ি উচ্চবিদ্যালয়, নীলফামারী সদরের দুবাছড়ি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, মেরামত ও সংস্কার প্রকল্পের আওতায় ডোমারের চিলাহাটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, চিলাহাটি সরকারি কলেজ, ডোমার বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং নীলফামারী মহিলা কলেজ, নীলফামারী সরকারি কলেজ (কলেজ ফান্ড) নির্মাণকাজসমূহের প্রোগ্রেস রিপোর্টসহ বিভিন্ন তথ্যের বিষয়ে শুনানি হয়। এছাড়া আবু তাহেরের বিরুদ্ধে চলমান বেসরকারি কয়েকটি স্কুলের মেরামতসহ আসবাবপত্র সরবরাহ কাজের তথ্যের বিষয়েও বক্তব্য জানতে চাওয়া হয় শুনানিতে।
এছাড়া ২০১৯-২০ সালের এক্সটেনশন অব ননগভর্নমেন্ট বিল্ডিং প্রকল্পের আওতায় ডোমার উপজেলার ভোগডাবুড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের কার্যাদেশে বিল্ডিংয়ের পুরাতন ছাদ ভেঙে নতুন ছাদ নির্মাণের মাধ্যমে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করার কথা বলা হলেও ছাদ না ভেঙেই পুরাতন ভবনের ওপরে ঊর্ধ্বমূখী ভবন নির্মাণ করায় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া এবং এই কাজও সহকারী প্রকৌশলী আবু তাদের সিন্ডিকেট কর্তৃক করা এবং দরপত্র মূল্যের ৭১ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করার বিষয়ে শুনানি হয়। অন্যদিকে জলঢাকার চেরেঙ্গা ঝারপাড়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১০ মে ২০২০ তারিখে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কাজটি হয়নি। অথচ চলতি বছরের ১ জুন থেকে ৩০ জুনের মধ্যে হঠাত্ করেই ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৩২ লাখ টাকা বিল প্রদান এবং এই কাজও আবু তাহের নিজ সিন্ডিকেট দিয়ে করিয়ে বিল তুলে নেওয়ার বিষয়ে শুনানি হয়।
শুনানিতে তাহেরের বিরুদ্ধে ওঠা একই প্রকল্পের সদর উপজেলার ফকিরগঞ্জ দাখিল মাদরাসার ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ ১০ জুন ২০২১ তারিখে দেওয়া হলেও কার্যাদেশের ১০ দিন আগে কাজ শুরু দেখিয়ে এবং ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে মেসার্স তোতা এন্টারপ্রাইজের নামে ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল দেয়া এবং এই কাজও আবু তাহের নিজ সিন্ডিকেট দ্বারা পরিচালনার অভিযোগের বিষয়ে শুনানি হয়। এছাড়া কিশোরগঞ্জ উপজেলার ভেন্ডাভেড়ি জুম্মাপাড়া দাখিল মাদ্রাসার ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ ১৫ জুন ২০২১ তারিখে দেওয়া হলেও কার্যাদেশের ১৫ দিন আগেই কাজ শুরু দেখিয়ে ২০ ভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ার কারণে বিল প্রদান না করার বিষয়ে শুনানি হয়। একই প্রকল্পের আওতায় আবু তাহের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা ডিমলার জটুয়াখাতা উচ্চবিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে দিনাজপুরের সদর উপজেলার মেসার্স ই আমান কন্সট্রাকশনের নামে সমুদয় বিল উত্তোলন করার বিষয়টি নিয়েও শুনানি হয়।
অন্যদিকে ২০১১ সালে রংপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামো নির্মাণের ১৫টি গ্রুপের প্রায় ৩ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান না করেই গোপনে কয়েক জন ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার নামে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া সিন্ডিকেটের সঙ্গে আবু তাহেরের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে শুনানি হয়।
শুনানিতে উঠে আসে সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহেরের রংপুর মহানগরীর মুন্সীপাড়ায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের জমি ক্রয়, তাতে বহুতল ভবনের ফাউন্ডেশন, (হোল্ডিং নং ১১৯/১, রোড নং ৫) চতুর্থ তলার কাজ শেষে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা নির্মাণের কাজ, শালবন মৌজায় ২ কোটি টাকা মূল্যের জমি ক্রয় করে সেখানে দ্বিতল ভবন নির্মাণ, গ্রামের বাড়িতে প্রায় ১৬ কোটি টাকা মূল্যের ৬২ বিঘা জমি ক্রয় করার বিষয়টি।
নীলফামারী জেলার সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের বলেন, ‘একটি চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার ক্ষতি করার জন্য এসব মিথ্যা অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে দিয়েছে। আমার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এসব মিথ্যা অভিযোগের কারণে সেটি হলো না। এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বিষয়টি আমি শুনানিকালে তদন্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।’ এর বাইরে এসব অভিযোগের বিষয়ে আবু তাহেরের কাছে জানতে চাইলে এ বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।