গত সোমবার রাতে রংপুর জেলা সিআইডির এএসপি সারোয়ার কবীরের নেতৃত্বে একটি টিম দিনাজপুরের চিরিরবন্দর থানার নান্দেডাই গ্রামে যায়। এক পর্যায়ে গ্রামের বাসিন্দা জহুরা বেগম ও তার ছেলে জাহাঙ্গীরকে অপহরণ করে। পরে অপহূতদের স্বজনদের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মঙ্গলবার বিকালে মুক্তিপণের টাকা নিতে সারোয়ারসহ তিন সিআইডি সদস্য মাইক্রোবাসে করে দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বাঁশেরহাটে যান। ঐ সময় চিরিরবন্দর থানাপুলিশের একটি টিম মাইক্রোবাসটিকে ধাওয়া করে। পরে মহাসড়কে জনতা মাইক্রোবাসটি আটক করে। পুলিশ তিন জনকে আটক করে দিনাজপুর ডিবি অফিসে নিয়ে যায়। আটককৃতদের নাম পরিচয় যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হন যে তারা পুলিশ সদস্য।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন : রংপুর জেলা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সারোয়ার কবীর, এএসআই হাসিনুর রহমান ও কনস্টেবল আহসান-উল হক ফারুক। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে এই অপহরণের সঙ্গে জড়িত শফিউল আলম পলাশ ও মাইক্রোবাস চালককে গ্রেফতার করে।
এ ব্যাপারে রংপুর সিআইডির ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার আতাউর রহমান বলেন, ‘সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করে আমার অনুমতি ছাড়া ভাড়া করা একটি গাড়ি নিয়ে তারা অপারেশনে যায়। আটক হওয়ার পর আমাকে জানানো হয়েছে। তারা যে আমাদের স্টাফ তা আমি জানিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘এএসআই হাসিনুর রহমান ও কনস্টেবল আহসান ছুটিতে ছিলেন এবং এএসপি সারোয়ার ডিউটিতে ছিলেন। তবে এএসপি কাউকে না জানিয়েই দিনাজপুরে গেছেন। তারা যদি দিনাজপুরে গিয়ে অপহরণ বা কোনো বেআইনি কাজ করে থাকেন, তাহলে তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে ঐ অপহরণের ঘটনায় গতকাল বুধবার দুপুরে অপহূতের স্বামী লুত্ফর রহমানের ছোট ভাই খলিলুর রহমান বাদী হয়ে চিরিরবন্দর থানায় একটি মামলা করেন। ঐ মামলায় পুলিশ গ্রেফতারকৃত পাঁচ জনকে বিকালে কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে দিনাজপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিশির কুমার বসুর আদালতে হাজির করে। আদালতে পাঠানো পুলিশি আবেদনে তাদের রিমান্ড প্রার্থনা করা হয়েছে কি না, এ বিষয়ে কোনো সূত্রই নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি। তবে আদালত সূত্র জানায়, তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার বাদী খলিলুর রহমান বলেন, চিরিরবন্দরের পলাশ নামের এক ব্যক্তি লুত্ফরের বিরুদ্ধে রংপুর সিআইডি কার্যালয়ে প্রতারণার একটি অভিযোগ করেন। গত সোমবার সন্ধ্যায় তার ভাই লুত্ফর রহমান চিরিরবন্দরের নান্দেডাই গ্রামের স্থানীয় বাজারে যান। সে সময় বাড়িতে ছিলেন লুত্ফরের স্ত্রী, ছেলে ও ছেলের বউ। সিআইডির এএসপি সারোয়ার কবীরের নেতৃত্বে একটি দল রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ বাড়িতে যায়। তারা লুত্ফরকে আটক করতে এসেছে বলে জানায়। লুত্ফরকে না পেয়ে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। টাকা ও স্বর্ণালংকারও লুট করে। এরপর লুত্ফরের স্ত্রী জহুরা বেগম ও ছেলে জাহাঙ্গীরকে মারধর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চলে যায়।
লুত্ফরের ভাগেন শামসুল আলম মানিক জানান, ঘটনার পর থেকে লুত্ফরকে কোথাও পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে তাদের মোবাইল নম্বরে দফায় দফায় ফোন করে বলা হয়, জহুরা ও জাহাঙ্গীরকে মুক্তির বিনিময়ে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। বিষয়টি চিরিরবন্দর থানায় জানান মানিক ও খলিলুর। এরপর পুলিশের সঙ্গে পরামর্শ করে মুক্তিপণের টাকা নিতে অপহরণকারীদের মঙ্গলবার বিকালে বাঁশেরহাটে আসতে বলা হয়। অপহরণকারীরা বাঁশেরহাট এলে পুলিশ তাদের মাইক্রোবাসটিকে ধাওয়া করে। এ সময় জনতাও পুলিশকে সহায়তা করে। এক পর্যায়ে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের কারণে মাইক্রোবাসটি আটকা পড়ে। পরে পুলিশ গাড়ি থেকে তাদেরকে আটক করে। উদ্ধার করা হয় জহুরা ও তার ছেলেকে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চিরিরবন্দর থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার জানান, অপহরণের মামলায় আটকদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আদালতে পাঠানো হলে তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।