প্রয়াণ দিবস

জাতীয় কবির দুর্গতি কি ঘুচবে না?

জাতীয় পর্যায়ে তাঁর জন্ম-মৃত্যুর অনুষ্ঠান উদযাপিত হলেও সু-সম্পাদিত একসেট ‘নজরুল রচনাবলী’ প্রকাশের শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করতে পারেনি তাঁর সজাতীয় গণমানুষেরা। ১২ খণ্ডে প্রকাশিত আমাদের দেশের প্রথিতযশা পণ্ডিত-গবেষকের বৃহত্ একদল সংঘবদ্ধ হয়ে এই অসাধ্য কর্ম সম্পাদন করেছেন, কিন্তু হারিয়ে গিয়েছে নজরুলের সেই বিখ্যাত ‘প্রজাপতি প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা’ শিশুতোষ গানটি। আবার একই গান দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডে পরপর দু’বার ছাপা হয়েছে ‘পরজনমে দেখা হবে প্রিয়।/ভুলিও মোরে হেথা ভুলিও’ এক খণ্ডে তালের নাম ‘পরজ—একতালা’, আরেক খণ্ডে ‘গরজ—একতালা’। তাছাড়া বিভিন্ন ত্রুটি আছে অনেক, যা অল্প কথায় বলে শেষ করার নয়। 

তাই বলি, এই দুঃখ রাখার জায়গা কোথায়?

প্রখ্যাত জীবনীকার গোলাম মুরশিদ নজরুলকে ‘অতিমানব’ বলে আখ্যায়িত না-করে থাকতে পারেননি। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও সুপ্রচুর তথ্যাদি বিচার-বিশ্লেষণের পর তিনি মন্তব্য করেছেন: শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বিত্তের সামর্থ্য, সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিপার্শ্ব বিবেচনায় ‘যে অবস্থা থেকে ’তিনি‘ যা হয়েছিলেন’, তাতে তাঁকে ‘অতিমানব’ ছাড়া আর কী-ই বা বলা চলে! বলা হয়েছে, তাঁর জীবনের কিছু কিছু ঘটনা এখনো লিপিবদ্ধ হয়নি। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যত্ জীবনীকারেরা অপরিচয়ের দেয়াল ভেঙে তাঁর লেখা থেকে তাঁকে ঠিকই খুঁজে বের করে আনবেন! এই চেষ্টা যে অনেকটাই সফলতার সঙ্গে সাধিত হয়েছে, তা আমাদের স্বীকার করতে হবে, কিন্তু তাঁর জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এখনো অনসন্ধেয় রয়ে গিয়েছে তা স্বীকার করতেই হবে।

আমরা জানি, অসাধারণ প্রতিভাধর, অস্বাভাবিক ব্যতিক্রমী প্রাণোচ্ছল আড্ডাবাজ নজরুল মাঝে-মাঝেই শরত্চন্দ্র প্রমুখের সঙ্গে বেহিসেবি আড্ডায় মিলিত হয়ে সৃজনশীলতার অনুশীলন করতেন। কল্লোল-গোষ্ঠীর সুপরিকল্পিত সুদীর্ঘ ধারাবাহিক প্রচার-প্রোপাগান্ডায় ‘ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ’ শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ৫৩তম জন্মবার্ষিকীর উত্সব পালিত হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে প্রমথ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১৯২৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বা ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের ৩১ ভাদ্র বিকেলে। এই অনুষ্ঠানের উত্সাহী উদ্যোক্তাদের মধ্যে নজরুল নিজেও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সে-কথাটা বলা হয় না। শরত্চন্দ্র-সংবর্ধনার উক্ত অনুষ্ঠানে দিলীপ কুমার রায়, সাহানা দেবী ও নলিনীকান্ত সরকারের সহযোগী হয়ে নিরুপমা দেবী রচিত ‘তুমি যে মধুকর কমলবনে’ উদ্বোধন-গীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন—এই তথ্যটুকু শুধু জানতে পারা যায়। কিন্তু নজরুলের লেখা ‘কোন শরতে পূর্ণিমার চাঁদ আসিলে এ ধরাতল’ গানটি যে সাহানা দেবী ঐ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন, এবং যতীন্দ্রমোহন বাগচী, নরেন্দ্র দেব ও নজরুলের আরো-আরো গানও ঐদিনের অনুষ্ঠান শেষে পরিবেশনের পরিকল্পনা ছিল,...অনুষ্ঠানোত্তর একটা ঘরোয়া আড্ডায়ও তাঁরা বেহালার শ্রী মণীন্দ্র রায়ের ‘প্রকাণ্ড চক-মিলানো বাড়িতে’ শরত্-সংবর্ধনার অভ্যর্থনা-সমিতির সভ্যদের নিয়ে একটি সান্ধ্য-সম্মিলনীর’ ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে-ফরাসে বৈঠকী-ঢংয়ে হেলান দিয়ে চা-পান-আহার, গান-বাজনা-হাস্য-পরিহাসের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। ‘শরত্-সন্ধ্যায় শরত্-সঙ্গে’ শিরোনামে বিবরণটা উত্তরা পত্রিকায় লিখেছেন শরত্-সংবর্ধনার অভ্যর্থনা-সমিতির সহকারী সম্পাদক শ্রী অখিল নিয়োগী। তিনি জানিয়েছেন,—ঐ আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং শরত্চন্দ্র এবং কল্লোল-সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ ও নরেন্দ্র দেব, গোপাল সান্যাল, পূর্ণ চক্রবর্তী, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, দিলীপ কুমার, নজরুল, কালিকলম সম্পাদক মুরলীধর প্রমুখ। কিন্তু না শরত্-জীবনী, না নজরুল-জীবনী—কোথাও এই তথ্য দেখতে পাওয়া যায় না।

নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো সাংবিধানিকভাবে তিনি স্বীকৃত নন। নজরুল অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত ছিলেন বাক্রুদ্ধ অবস্থাতেই। তাঁকে রইসউদ্দিন, মঈজুদ্দিন গংদের যে-পুরস্কার দেওয়া হয়—তার একখান মেডেল না দিলেই কি চলত না? এইভাবে জীবন্মৃত কবিকে যেভাবে পুরস্কারের নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল, তা নিয়ে ক্ষোভ ছিল সমাজে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাহমুদ নূরুল হুদা ‘চিরঞ্জীব নজরুল’ গ্রন্থে লিখেছেন—নির্দিষ্ট সময়ে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান আরম্ভ হলো। এ সময় নজরুল পিজি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। একুশে পদক দেবার জন্য তাঁকে পিজি থেকে আনা হয়। বিদ্রোহী কবি জাতীয় কবি নজরুলের মাথায় কিস্তি টুপি (খদ্দরের প্রিয় দোপাল্লা টুপি নয়। পরনে পাঞ্জাবী পায়জামা, পায়ে স্যান্ডেল—একটি ইনভেলিড হুইল চেয়ারে বসিয়ে একজন সুসজ্জিতা নার্স (যিনি পিজিতে কবিকে দেখাশোনা করতেন) কবিকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে অনুষ্ঠান হলে প্রবেশ করেন এবং রাষ্ট্রপতি নেমে এসে কবির গলায় ‘একুশে পদক’ পরিয়ে দেন।

নজরুল ইসলামকে ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারেও ভূষিত করা হয়েছিল, কিন্তু ক’জনইবা সে-তথ্য জানেন! আর শতটা জাতীয় পুরস্কারে তাঁকে ভূষিত রঞ্জিত করলে কী হবে, তাঁর প্রতি আমাদের জাতীয় অ্যাটিচিউড কিন্তু করুণাজাতীয়। তাঁর রচনাবলী আমরা খোয়াতে কুণ্ঠাবোধ করি না। নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে তা সর্বাগ্রে প্রকাশ পেত তাঁর রচনার প্রতি আমাদের মমত্ববোধ থেকে! তাঁর রচনাবলী সম্পাদনা, প্রুফ দেখার সময়ই প্রকাশ পেয়ে যায়, প্রকৃতপক্ষে তাঁকে আমরা কোন দৃষ্টিতে দেখে থাকি!