মসজিদকেন্দ্রিক জাকাত বণ্টন ব্যবস্থা

মুসলমানদের জন্য জাকাত একটি ফরজ বা অবশ্যপালনীয় বিষয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে সেটি জাকাত পাওয়া যোগ্য ব্যক্তিদের মাঝে বণ্টন করা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যকরণীয় আমল। এতে সম্পদ পরিশুদ্ধ হয় ও বৃদ্ধি পায়। আল কোরআনের বাণী অনুযায়ী আমাদের সম্পদের মধ্যে দুস্থ ও অসহায় মানুষের অধিকার রয়েছে। এই বিশ্বাস মুসলমানদের রাখতে হবে। সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টেকসই হতে পারে না। এজন্য অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে দেশে উত্পাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ধনী-গরিবের বৈষম্য হ্রাস করাও প্রয়োজন। জাকাতের মাধ্যমে এ বৈষম্য হ্রাস পায়।

মুসলমান হিসেবে আমাদের বিশ্বাস হলো, মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রদান করেছেন। তিনি আমাদের চোখ, হাত, পা, কান ও মস্তিষ্ক দান করেছেন এবং আমরা কেউই নিজেকে নিজে সৃষ্টি করিনি। আমাদের অর্থসম্পদ তারই দান। আমরা বিশ্বাস করি, দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের শস্যক্ষেত্র ও পরীক্ষাকেন্দ্র। তিনি আমাদের কম বা বেশি ধনসম্পদ দান করে পরীক্ষা করছেন এবং আমরা সবাই মহান আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনকারী, এই সবকিছুর ব্যাপারে একদিন আমরা জিজ্ঞাসিত হব। আমাদের অর্থ, আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যবহার করব, এটাই একান্ত কাম্য।

মুসলিম হিসেবে জাকাতের গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্য সিলেট শহরের আখালিয়ার সুরমা আবাসিক এলাকা ও খুলিয়াপাড়ার তিনটি ঘটনাপ্রবাহের আলোচনা করা হলো :১. সুরমা আবাসিক এলাকা মসজিদে প্রায় ৮০ বছরের একজন দরিদ্র মানুষ নামাজ পড়তেন। পুরোনো তালিযুক্ত কাপড় দেখে তার অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে অনুমান করা যেত। তিনি আজ পৃথিবীতে নেই। থাকতেন ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে। একদিন ঘটনাক্রমে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, শরীর দুর্বল হয়ে আসায় তিন বেলা ভাত খাওয়া ছাড়া তিনি চলতে পারেন না এবং গত সাত দিন যাবত্ ১০ টাকা দিয়ে ক্রয়কৃত টম্যাটো ভর্তা দিয়ে ভাত খাচ্ছেন। ভ্যানচালক সন্তানের পক্ষে (সাত-আট জন সন্তানের পিতা) তার ভরণপোষণ অত্যন্ত কষ্টকর। তিনি এটাও জানালেন, তাকে সাহায্য করার মতো কোনো আত্মীয়স্বজন নেই।

২. দরিদ্র ধার্মিক ব্যক্তিটি মৃত্যুবরণ করার পর প্রায় ৭৫ বছর বয়সি তার স্ত্রী একইভাবে অসহায় হয়ে পড়েন। ৩. খুলিয়াপাড়া আবাসিক এলাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় একজন অসহায় ও অত্যন্ত দরিদ্র মহিলা আছেন, যিনি ভিক্ষার জন্য খুলিয়াপাড়া এলাকায় প্রায়ই আসেন। এলাকার অনেকেই মহিলাটিকে পাগলি বলে ডাকেন। হঠাত্ দেখা হলে বলতেন, ‘স্যার, আজ দুদিন যাবত্ কিছু খাইনি। আমাকে সাহায্য করেন।’ একদিন বললেন, ‘বাসায় কাজ করার সময় গরম পানি পড়ে আমার পা পুড়ে গেছে। টাকার অভাবে চিকিত্সা করাতে পারছি না।’ অন্যদিনের ঘটনা। ঐ মহিলা খুলিয়াপাড়া মসজিদের সামনে এসে কাঁদছেন। সঙ্গে কিছু কাপড়, বালিশ, হাঁড়িপাতিল, কাঁথা ইত্যাদি। বললেন, ‘করোনার কারণে কলোনির বাসাভাড়া বাবদ ৫০০ টাকা দুই মাস যাবত্ দিতে পারিনি। তাই আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে।’

এসব আমাদের সমাজের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ধনী ব্যক্তির জাকাতের টাকায় এ ধরনের সমস্যার সমাধান হতে পারে খুব সহজেই। সবার পক্ষে বিভিন্ন কারণে কাজ করে খাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। অসহায় মানুষের সাহায্যে জাকাতের গুরুত্ব এবং মসজিদকেন্দ্রিক জাকাত বণ্টন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা হলো নর্থ-ইস্ট মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপ্যাল শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুনাজ্জির আলীর সঙ্গে। তিনি সুরমা আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি। ধরি, সুরমা আবাসিক এলাকায় ২০টি পরিবার আছে, যারা জাকাত পাবার যোগ্য। প্রতিটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা যদি পাঁচ জন হয়, তাহলে সুরমা আবাসিক এলাকায় জাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তির সংখ্যা (২০×৫) = ১০০ জন। চাল-ডাল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় বাবদ প্রতি ব্যক্তি মাসে ন্যূনতম ৬০০ টাকা পেলে কোনোরকম চলতে পারেন। তাহলে প্রতি মাসে সুরমা এলাকার জন্য জাকাতের অর্থ প্রয়োজন (৬০০×১০০) = ৬০,০০০ টাকা। এজন্য বছরে অর্থের প্রয়োজন (৬০,০০০×১২) = ৭,২০,০০০ টাকা।

সুরমা আবাসিক এলাকার মসজিদে নামাজ পড়েন এমন ধনী ব্যক্তি আছেন অনেকেই। তাদের মধ্য থেকে সমমনা ১০-২০ জন ধনী মুসল্লি একত্রিত হয়ে এমন একটি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারেন, যাতে সেসব অভাবী মানুষের আর্থিক সংকট দূর হয়। এজন্য মসজিদ কমিটির সঙ্গেও সমন্বয় করা যায়। তারা জাকাতের পাশাপাশি অন্যান্য দান-সাদকাও করতে পারেন এবং নিজ এলাকায় দারিদ্র নিরসনে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। অন্যান্য মসজিদেও সমমনা মুসল্লির মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক জাকাত বণ্টনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব এবং এতে মসজিদের সঙ্গে দরিদ্র জনগণের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে এবং এটা হতে পারে মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে সাফল্য লাভের উপায়। এক পর্যায়ে জাকাত প্রদানের মাধ্যমে ঐ সব অভাবী ব্যক্তির বা তাদের ভরণ-পোষণকারীদের পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি আমরা, যাতে তারা একসময় নিজেরাই জাকাত প্রদানে সক্ষমতা অর্জন করেন। এভাবে যদি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অভাব মোচন করা হয় এবং তারা স্বকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে আমরা পেতে পারি এক স্বর্গীয় অনুভূতি।

lলেখক :অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট