জ্যামে চাকা বন্ধ শুধু পোড়া তেলের গন্ধ

১১ আগস্ট ২০২১ রাস্তায় অর্ধেক যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ঘোষণা এলে কেউ তা মানেনি। তার আগের রাত থেকে মানুষ সবকিছু নিয়ে রাস্তায় নেমে গেছে। ১২ আগস্ট থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সড়ক, রেল, নৌপথে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব যানবাহন চলাচল করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। গণপরিবহনে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাস্তায় চলাচল করতে নির্দেশ দেওয়া হলেও তার অনেক আগেই মানুষ রাস্তায় নেমে যায়। চলাচলকারীদের নানা অজুহাতের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিতরা ছিলেন বড়ই অসহায়।

গণপরিবহন চালুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে গাড়িসহ রাস্তায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকার মজাটা আবার শুরু হয়েছে। লকডাউন তুলে নেওয়া হলে দেশের রাস্তা, নদী, রেল ফিরেছে আগের পরিবেশে—সেই চিরচেনা চেহারায়। রাস্তা খুলে দেওয়ার প্রথম দিন একটু সহনীয় পরিবেশ থাকলেও দ্বিতীয় দিন থেকে ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণ পরেই প্রায় সব বড় রাস্তার চারকোনা মোড়গুলোতে ভয়ানক জ্যাম লেগে সবাই থেমে যাচ্ছিল। চার দিকের বাস-কার-ভ্যান, রিকশা, টেম্পো, সিএনজি সবাই মোড়ের মাথায় পৌঁছেই একযোগে যে যার সামনে মাথা ঢুকিয়ে এগোতে চাইতেই এসে গেল স্থবিরতা। মনে হলো অনেক দিন কেউ কাউকে হর্ন শোনাননি বা নিজেও শুনেননি। তাই হর্ন দেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। সবাই থমকে থাকলেও কার কী আসে যায়?

বিপত্তি শুধু অ্যাম্বুলেন্সে থাকা মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে। ট্রাফিক পুলিশের হুইসেল বাজিয়ে আন্তরিক তত্পরতা দেখিয়ে অ্যাম্বুলেন্সকে সামনে যাওয়ার জন্য পথ করে দিতে তত্পর। তবে তিনিও নিষ্ফল, চরম অসহায় এত বড় জ্যামের ভিড়ে। রোগীর নিঃশ্বাসের অস্বাভাবিক ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে থাকা স্বজনদের উত্কণ্ঠা ও কান্না থামানোর মতো কোনো ব্যবস্থা বা পরিবেশ নেই তখন। ভ্যানে রোগী নিয়ে থমকে থাকা ইউনুস চিত্কার করে বলছে, এতদিন লকডাউনেই ভালো ছিলাম। এতদিন চাকা ঘুরত, গাড়ি দৌড়াত। রোগীকে তখন দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে জীবন রক্ষা করেছি। আজ আর পারছি না। ওর মনটা খারাপ তো হলোই, সঙ্গে পাশে বসা রোগীর স্বজনের কান্নায় নিজের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। তার রোগীর অক্সিজেনের সিলিন্ডার ফাঁকা হয়ে আসছে। তিনি ছটফট করছেন, আর বলছেন, পোড়া তেলের গন্ধ আর সহ্য হচ্ছে না! রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়ির সামনে দিয়ে সেই করোনাকালের  আগের মতো ঠেলাঠেলি করে মানুষ রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। কারো মাস্ক থুতনিতে, কারো পকেটে। কারো কারো একেবারেই নেই। ভয়ভীতির কোনো বালাই নেই কারো চোখে-মুখে। করোনা কি তবে উধাও হয়ে গেছে? প্রশ্ন ভ্যানচালক ইউনুসের। কিন্তু কে শোনে তার কথা?

আমেরিকা ইউরোপে লকডাউন শিথিল করে পর্যটন, সমুদ্রসৈকত খুলে দেওয়ার এক মাসও হয়নি। সেখানে আবার সংক্রমণ ও মৃত্যু শুরু হয়েছে। নিউজিল্যান্ডে পুরো দেশে মাত্র ১৯ জন করোনা রোগী পাওয়ায় সারা দেশে পুনরায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের দেশে সংক্রমণ হার ২০ শতাংশ থাকতেই এবং দৈনিক মৃত্যু সংখ্যা দেড় শতাধিক চলা অবস্থাতেই কড়াকড়ি এত শিথিল করে ফেলা হলো কেন? কার স্বার্থে করা হলো এমনটি? মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা না করে করোনা-সংক্রান্ত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির পরামর্শের তোয়াক্কা না করে যদি সিদ্ধান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়, তাহলে স্বাস্থ্যবিধি পালনের তত্ত্বীয় কথা কাকে শোনানো হচ্ছে?

স্বাস্থ্যবিধির কথা শোনানোর মধ্যে হাইজ্যাকার ও কিশোর গ্যাং মানুষের ঘাড় ধরছে, ফেরিতে, বাসে ঠেলাঠেলি করে নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে না পেরে অনেকে মারা যাচ্ছে, শোক ও আনন্দ মিছিল করছে, পুলিশ আসামির হাত চেপে ধরে টানাহ্যাচড়া করে কোর্টের বারান্দায় ভিড় করে ঠেলাঠেলি করছে, লক্ষ মানুষ চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে একসঙ্গে জানাজা পড়ছে, পর্যটনকেন্দ্রে সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাচ্ছে, সাগরে সাঁতরাচ্ছে—এগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানা-না-মানার কোনো বালাই নেই।

ইন্দোনেশিয়ায় সিনোভ্যাক টিকা নেওয়ার পরও বহু চিকিত্সক ও সাধারণ মানুষ মারা গেছেন। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে টিকা নেওয়ার পরও কেন পুনরায় সংক্রমণ ছড়ানো শুরু হয়েছে সে কথা কেউ কি চিন্তা করছেন? দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও ডেলটার আক্রমণে ২৪ ঘণ্টায় পুনরায় লক্ষাধিক সংক্রমণ দেখা গেছে (বাংলানিউজ২৪.কম আগস্ট ৮, ২০২১)। ফলে ডেলটা নিয়ে শঙ্কিত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র।

আমরা যেসব টিকা গ্রহণ করেছি তার মেয়াদ কত দিনের? এর মাধ্যমে সৃষ্ট অ্যান্টিবডি মানবশরীরে কত দিন প্রতিরোধশক্তি জোগাবে? কলেরা বসন্তের মতো এখনো করোনার টিকার কার্যকারিতা ও মেয়াদ নিয়ে কোনো কার্যকর গবেষণা রিপোর্ট গণমাধ্যমে না আসায় আমরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছি। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করে জোর দিয়ে বলছেন, করোনা দু-এক বছর নয় বরং দু-এক যুগ স্থায়ী হতে পারে। তাই আমাদেরকে অতি সতর্কতার সঙ্গে করোনাকে মোকাবিলা করে এর সঙ্গে উপযোজন বা অ্যাডাপ্টেশন করে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। তার আগে হুড়মুড় করে সবকিছু শুরু করতে গেলে নিজেরাই সভ্যতার বলি হওয়ার আশঙ্কা অপার।

লকডাউন খুলে দেওয়ার পর রাস্তায় গাড়ি বের করা হলেও সব চাকা ঘুরছে না। দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরির জন্য লাইন দিয়ে সড়কে তিন দিন ধরে পণ্যবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। রাজধানীসহ সড়কে শুধু জ্যাম আর জ্যাম। সারি সারি গাড়ি গিজগিজ করে পিঁপড়ার মতো দাঁড়িয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে। আমাদের সব পেশাদারিত্বের ওপর মন্দ রাজনৈতিক চর্চা ও অনৈতিক চাপ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর ওপর করোনার মরণকামড়ের মধ্যে ডেঙ্গুর চোখরাঙানি বড়দের সঙ্গে বাচ্চাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি শুরু করে দিয়েছে। এমতাবস্থায় চারদিকে স্থবিরতা সৃষ্টি করে হাত গুটিয়ে রাস্তায় বসে বসে তেল পুড়িয়ে গন্ধ ছড়াতে থাকলে তার কটুপ্রবাহ পরিবেশের সঙ্গে মিশে শীতাতপের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা মানুষগুলোকেও ক্ষমা করবে না। কারণ, তারা সামষ্টিক পরিবেশের বাইরের কোনো অ্যালিয়েন নয় যে গন্ধ শুঁকে ঊর্ধ্বাকাশে পালাবে! তাই অচিরেই এর একটি ইতিবাচক বিহিত ব্যবস্থা করার জন্য সবাইকে সবার জন্য সচেতন থেকে বাঁচার চেষ্টা করা ছাড়া উপায় নেই।

n লেখক :রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন