সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নৌকা তৈরির কারিগরদের ঠক ঠক শব্দের কর্মযজ্ঞ চলছে। বাপ-দাদা হতে প্রাপ্ত এই শিল্পকে আঁকড়ে ধরে হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় শৈল্পিক সৌন্দর্যে তৈরি হয় এসব নৌকা। তালায় তৈরি হওয়া এসব নৌকার কদর রয়েছে খুলনা বিভাগ জুড়ে। নদীমাতৃক এই দেশে এক সময় যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হতো নৌকা। তবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে অর্ধশতাধিক লোকের।
সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের কোল ঘেঁষে তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা এলাকার গড়ে উঠেছে নৌকা গড়ার কারখানা। প্রতি বছর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার অন্যতম উপকরণ নৌকা থাকার কারণে তালা উপজেলায় সারা বছর নৌকা তৈরির কাজ করতে হয় কারিগরদের। এছাড়া সাতক্ষীরাসহ খুলনা বিভাগের ঘের ব্যবসায়ীরা ক্রয় করেন এই নৌকা। তবে আধুনিক প্রযুক্তির বিশে^ নৌকা তৈরি করতে এখনো লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া।
তালা উপজেলার নৌকার তৈরির কারিগররা সাধারণত ডিঙ্গি ও কোষা ২ ধরনের নৌকা তৈরি করে থাকেন। কোষা ৯-১০ফুট আর ডিঙি নৌকা ১৫-১৬ ফুট দৈর্ঘ্য হয়ে থাকে। কাঠসহ প্রয়োজনীয় মালামাল প্রস্তুত থাকলে দৈনিক ২টি থেকে ৩ টি নৌকা তৈরি করা সম্ভব হয়। তবে এখানে সবচাইতে কোষা নৌকার কদর বেশি রয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। কিন্তু অতীতের থেকে বর্তমানে নদ-নদীর সংখ্যা কম ও নৌ পথে চলাচলের মধ্য সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায় চলছে মন্দা। মুনাফার পরিমাণ কম হলেও ধরে রেখেছে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত এই শিল্প।
সাধারণত নৌকা তৈরিতে খৈ, কড়ই ও চম্বল, সুন্দরী গাছের কাঠ, ধাতু দ্রব্য পেরেক, তারকাটা, জলুয়া ব্যাবহার হয়ে থাকে। তাছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেহগনি গাছের কাঠ ব্যাবহার করে থাকেন কারিগররা। একটি ১২ হাত লম্বা একটি নৌকা তৈরি করতে তিন জন শ্রমিক এর মজুরী প্রায় ২২-২৫শ’ টাকা। এবং কাঠ বাবদ খরচ হয় চার হাজার টাকা,নানা বিধি আনুষঙ্গিক উপকরণ বাদে খরচ হয় তিন হাজার টাকা। নয় থেকে দশ হাজার টাকা খরচ করে একটা নৌকা বিক্রি হয় ১২-১৪ হাজার টাকা।
মো. আনোয়ার হোসেন, রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন কারিগর জানান, প্রতিদিন সকল খরচ মিটিয়ে সামান্য কিছু টাকা লাভ হয় আমাদের। তারপরেও এই শিল্পকে আমরা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।
যশোর ঝিকরগাছা হতে নৌকা ক্রয় করতে আসা অরুণ সরকার জানান, তিনি ১২ হাত লম্বা একটি নৌকা ১৩ হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করেছেন। তার মৎস্য ঘেরে মাছের খাদ্য দেওয়া ও শেওলা পরিষ্কার করার জন্য এই নৌকা ব্যবহার করা হবে। যশোর জেলার অধিকাংশ মানুষ এখান থেকে নৌকা ক্রয় করেন।
পাটকেলঘাটা নৌকা তৈরির কারখানা মালিক মো. আনোয়ার হোসেন জানান, তার বাবা এই নৌ-শিল্পের কাজ শুরু করেন। পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত এই কারখানাটি তিনি ধরে রেখেছেন। বারো মাস নৌকা তৈরি করা হয়। তার কারখানায় মোট ১২জন শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিদিন ৪-৫ টা করে নৌকা তৈরি করা সম্ভব হয়। তবে নৌকা তৈরির সরঞ্জামের দাম ঊর্ধ্বগতির কারণে লাভ একটু কম হয়।
এছাড়া মো. রফিকুল ইসলাম এর কারখানায় কাজ করেন ১৫ জন শ্রমিক। তিনি এক যুগের বেশি সময় ধরে এই নৌ-শিল্প ধরে রেখেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায়, নৌকার চাহিদা অনেক কম। এখন এই নৌ-শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।
ইত্তেফাক/এমআর