উন্নত জীবনযাপন উন্নত স্বপ্ন দেখায়

একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে, একটি জাতিকে সমৃদ্ধ করতে, একটি রাষ্ট্রকে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য সমাজের যে শ্রেণি-পেশার মানুষের ভূমিকা অগ্রগণ্য, তাঁরা হচ্ছেন শিক্ষক। তাঁরাই পারেন তাঁদের পেশার সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করতে। এজন্যই এই পেশাকে মহান পেশা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। পৃথিবীর সমস্ত দেশে, সমস্ত কালেই এমনটাই হয়ে আসছে। একটি শিশুর শ্রেণিকক্ষের পাঠের বাইরে তার নান্দনিক উপলব্ধি, সৃজনশীল ভাবনা, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ ও তার জ্ঞানভাণ্ডার বাড়াতে একজন শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন শিক্ষক একজন ছাত্রকে স্বপ্ন দেখান ভালো কিছু করতে, দেশের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য কিছু করার শিক্ষা দেন। শিক্ষার্থীর সামাজিকীকরণ ও তার ব্যক্তিসত্তার সর্বাঙ্গীন বিকাশে প্রধান ভূমিকা রাখেন শিক্ষক। শিক্ষকের মানসিকতা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীর মনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। শিক্ষকের মানসিকতা, আচার-আচরণ ইতিবাচক হলে শিক্ষার্থীও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে উঠবে; দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। এভাবেই শিক্ষক-ছাত্র-দেশ সাইকেলটি সম্পন্ন হয়। এজন্যই চীনের প্রাচীন দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন, ‘শিক্ষক হবেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উত্স। তিনি হবেন একজন আদর্শ শাসক।’

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর এ মেরুদণ্ড যে কারখানায় তৈরি হয় তার নাম প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটি শিশু ভবিষ্যতে কতটুকু ন্যায়-নীতিমান, আদর্শবান, চরিত্রবান হবে এটি অনেকাংশে নির্ভর করে তার প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। শিক্ষার মূল ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা আর এর কারিগর হচ্ছেন প্রাথমিক শিক্ষক। তাঁরাই একটি শিশুর মনে প্রথম বীজ রোপণ করেন সততার, কর্তব্যপরায়ণতার, কাজের প্রতি আন্তরিকতার, পরোপকারিতার, সেবার ও  দেশপ্রেমের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাবা-মায়ের স্নেহ-মমতা দিয়ে শেখান কীভাবে অপরের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে হয়, কীভাবে সুন্দরভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে রাস্তা পার হতে হয়, কীভাবে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসতে হয়, কীভাবে দলগতভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয়, কীভাবে নিজের আনন্দ ভাগ করে নিতে হয়, আবার অন্যের দুঃখে সমবেদনা জানাতে হয়। তাই শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকরা  যেন ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন, তাঁদের সুযোগ-সুবিধা পর্যালোচনা করা কর্তৃপক্ষীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

বর্তমানে আমাদের দেশে খুবই অসহায় অবস্থায় আছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ। অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন একজন শিক্ষক যখন প্রাইমারি স্কুলে যোগদান করবেন তখন তিনি বাংলাদেশের বেতন কাঠামোর যে চারটি ধাপ আছে সেখানকার তৃতীয় ধাপে বা ১৩তম গ্রেডে চাকরি শুরু করবেন। এটা কখনো ভাবা যায় কিংবা মেনে  নেওয়া যায়? একজন অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন শিক্ষক হবেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী! উন্নত জীবন উন্নত চিন্তাভাবনা করতে শেখায়। যদি শিক্ষকশ্রেণি উন্নত জীবন যাপন না করেন, তাঁকে যদি শ্রেণিকক্ষের বাইরে তাঁর পরিবারকে নিয়ে ভাবতে হয়, তাঁর আর্থিক সমস্যা নিয়ে ভাবতে হয়, তাহলে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ভাবা বা গবেষণা করা বা উন্নত শিক্ষাদান করা কষ্টের কিংবা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য সরকারের উচিত হবে শিক্ষকদের চলমান সমস্যা দূর করে, তাদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো তৈরি করা যাতে করে তাঁদের সামাজিক স্বীকৃতির পাশাপাশি আর্থিকভাবেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজ সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।

সহকারী শিক্ষক, হাওলাদারডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফরিদপুর