সারওয়ার-উল-ইসলাম
ঠিক, এইখানটায়। ত্রিশ বছর আগে হেমন্ত শেষের কোনো এক রোববারের বিকেলবেলা। দাঁড়িয়েছিলাম একা। সামনে ঢালু বেয়ে নিচে নেমে গেছে সরুপথ। দূরে বিলের মাঝখানে ধানখেত। ধানখেতের পাশে ডোবা। সেখানে পলো দিয়ে মাছ ধরছিল বেশ কয়েকজন যুবক।
দুধ সাদা হাফশার্ট আর জিন্স প্যান্ট পরনে ছিল আমার। পায়ে চামড়ার সেন্ডেল। বরাবরের মতোই শার্টের ওপর থেকে বুকের কাছের বোতাম দুটি খোলাই ছিল। পেছন থেকে ‘হোপ’ শব্দ করে আমাকে চমকে দিয়েছিল এলাকার একটা মেয়ে। মেয়েটা অমনই। দস্যি মেয়ে বললে ভুল হবে না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে। মেয়েটা সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে।
ওর চিত্কারে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিলাম।
‘ভয় পেয়েছেন?’ বলেই হো হো করে হেসে ওঠে মেয়েটা।
‘কিছুটা।’
‘কেন?’
‘এভাবে পেছন থেকে আচমকা হোপ শব্দ করলে ভয় পাব না?’
‘কী দেখছিলেন?’
‘ঐ যে দূরে ধানখেতের পাশে ডোবায় পলো দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করছে, পারছে না।’
‘ছড়া-টড়া লিখবেন নাকি? আপনি তো ছড়া লেখেন শুনেছি।’
‘কে বলেছে, এই কথা?’
‘শুনেছি। আমাকে নিয়ে একটা ছড়া বানান তো।’—বলেই তাকিয়ে রইল আমার শার্টের বোতাম খোলা বুকের দিকে। অনেকক্ষণ।
‘কী দেখছ?’
কোনো কথা নেই। অপলক ওভাবেই তাকিয়ে থাকতে দেখে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছিলাম। একসময় মেয়েটা আমার বুকের কাছের দুটো বোতাম লাগিয়ে চলে গিয়েছিল বাড়ির দিকে। সন্ধ্যা নেমে আসছিল ততক্ষণে।
২.
সেই মেয়েটার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। একজনের মাধ্যমে চিরকুট দিয়েছিল। দুটো বাক্য লিখেছিল—‘আপনাকে ভালোবাসি। আপনাকে ছাড়া বাঁচব না।’
তার কিছুদিন পর বিয়ে হয়েছিল মেয়েটার এক বড়লোকের ঘরে। প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক ছিল ছেলেটা। আর কোনো খোঁজ জানি না। শুনেছি রাজশাহী থাকে।
৩.
ঠিক, এইখানটায়, আবার এসেছি ত্রিশ বছর পরে। সেই বিল নেই। দেশের বড় বড় রিয়েল স্টেট কোম্পানি হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্ট গড়ে তুলেছে বিল ভরাট করে। অথচ একসময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বলেছিল—এই বিল কখনো ভরাট করতে দিবো না। এই বিল এমনই থাকবে। কাব্য করেই বলেছিলেন—মানুষের ভেতরে যেমন ফুসফুস থাকে। শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার জন্য, ঠিক তেমনই এই বিল মিরপুর শহরের ফুসফুস। এটা সচল রাখতে হবে যে কোনো মূল্যেই।
কে শোনে কার কথা! কজনই বা কথা রাখে শেষ পর্যন্ত!
বিল রাখলে কেউ টাকা-পয়সার মালিক হতে পারবে না। তাই তো ফ্ল্যাট তুলে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন সুযোগ সন্ধানীরা। টাকাটাই আসল।
ঠিক, এইখানটায় দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিয়েছিল সেই মেয়েটা। চিরকুটে লিখেছিল—‘আপনাকে ভালোবাসি। আপনাকে ছাড়া বাঁচব না।’ সে কি তার কথা রেখেছে? রাখেনি। আমার সঙ্গে থাকলে অর্থকষ্টে থাকতে হতো তাকে।
তার সেই চোখের দৃষ্টি এখনো আমার কাছে জ্বলজ্বল করছে। বোতাম লাগাতে লাগাতে সে আমার এতটাই কাছাকাছি হয়েছিল যে, আমি তার শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়া টের পাচ্ছিলাম। সেই রাতে ঘুমাতেই পারিনি।
ঠিক, এইখানটায় এসে আজ এত খারাপ লাগছে কেন?
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য