যাত্রাবাড়ীর শেখদি এলাকার ছয় কন্যার জননী হনুফা বেগম শুক্রবার সকালে বাজার করতে বাসা থেকে বের হন। বাসার পাশে শেখদি জামে মসজিদের পূর্ব পাশের রাস্তা দিয়ে বাজারে যাওয়ার পথে সুফিয়া বেগমের তিনতলা বাড়ির ওপর থেকে আকস্মিকভাবে একটি ইট তার মাথায় পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে তিনি সেখানে লুটিয়ে পড়েন। আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। বাসা থেকে ছুটে আসেন তার স্বামী লিটন আক্তার। রক্তাক্ত হনুফাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিত্সকরা জানান, পথিমধ্যেই তার মৃত্যু হয়েছে।
শেখদির কাজীগাঁওয়ে একটি দোতলা বাড়ির নিচতলায় একটি কক্ষে হনুফা বেগম তার স্বামী ও ছয় কন্যাকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন। হনুফার বাড়ি গাইবান্ধার সদর উপজেলার গোয়ালবাড়ী গ্রামে। তার স্বামী যাত্রাবাড়ীর একটি রাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার বয়লার মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। অভাবের সংসারে ছয় কন্যার মধ্যে শুধু বড় মেয়ে শান্তার বিয়ে হয়েছে। লিপি ও শিল্পী যমজ মেয়ে। লামিয়া ও সামিয়ার বয়স ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে। ছোট মেয়ে সুরাইয়ার বয়স দুই বছর। মায়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে ছয় মেয়ের মধ্যে শোকের মাতম। এদের মধ্যে লামিয়া, সামিয়া ও সুরাইয়া মায়ের জন্য চিত্কার করে কাঁদছে। ক্ষুধার কারণে প্রতিবেশীরা তাদেরকে বিস্কুট কিনে খেতে দিয়েছেন। তাদের বাবা লিটন লাশের ময়নাতদন্তের জন্য তখন পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে অবস্থান করছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শেখদি জামে মসজিদের পূর্ব পাশের গলিতে মনসুর রহমানের তিনতলা বাড়ি। বাড়িটির দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হলে মনসুর রহমানের মা, ভাই ও বোনসহ সপরিবারে বসবাস করেন। তিনতলার ছাদ নির্মাণ করা হলেও এর দেওয়াল নির্মাণ হয়নি। দোতলা ও তিনতলার ছাদে বাগান। বাড়ির সামনের রাস্তার দিকে দোতলার ছাদে একটি পেয়ারাগাছ রয়েছে। ঐ গাছটি দোতলার ছাদ থেকে তিনতলার ছাদের স্থানান্তর করার জন্য মনসুরের বোন মাহমুদা একজন শ্রমিক ডাকেন। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে ঐ শ্রমিক পেয়ারাগাছের চারদিকে অস্থায়ী দেওয়াল থেকে ইটগুলো সরিয়ে ফেলছিলেন। বৃষ্টির পানিতে ইটগুলোতে শ্যাওলার আস্তর পড়ে গেছে। একটি ইট সরিয়ে নিতে গিয়ে হাত থেকে তা নিচে পড়ে যায়। ঐ ইটটি গিয়ে পড়ে হেঁটে যাওয়া হনুফা বেগমের মাথায়।
মাহমুদা বেগম বলেন, পেয়ারাগাছটিকে দোতলার ছাদ থেকে তিনতলার ছাদে স্থাপন করার জন্য একজন শ্রমিক নেওয়া হয়। ঘটনার পর ঐ শ্রমিক পালিয়ে গেছে। তার নাম-ঠিকানা আমরা জানি না। তবে ঘটনাটির জন্য আমরা খুবই মর্মাহত।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাযহারুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর পুলিশ পাঠানো হয়। সেখানে বাড়ির মালিকের কোনো ত্রুটি বা খামখেয়ালি আছে কি না—তা আমরা তদন্ত করছি। এ ব্যাপারে নিহতের স্বামীকে থানায় অভিযোগ দিতে বলেছি।
স্থানীয় ৬২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোস্তাক হোসেন বলেন, হনুফার মৃত্যুর বিষয় শুনেছি। হনুফার ছয়টি কন্যা সন্তানের মুখের দিকে চিন্তা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি। এ ব্যাপারে বাড়ির মালিকের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি।
হনুফার স্বামী লিটন আক্তার গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, যা হবার তা হয়েছে। কিন্তু এখন মা-মরা বাচ্চাগুলোর জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাই।