অণুভাবনা : ভিক্ষকশূন্য জাতিরাষ্ট্র হোক বাংলাদেশ

আবুল কাসেম

 

এমন কিছু চরম অসহায়ত্ব, যা মানুষকে ভিক্ষুকে পরিণত করে। যেমন বয়সের ভারে ন্যুব্জ সে, সম্পদের কানাকড়িও তার অবশিষ্ট নেই, সহায়ক কোনো হাতও তার দিকে নেই, ক্ষুধা নিবৃত্তির সম্মানজনক কোনো উপায় তার সামনে নেই, তখন তার জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে হাতপাতা বা ভিক্ষাবৃত্তি। যৌবনের শক্তিময় দিনগুলিতে সে হয়তো উদয়াস্ত কঠিন পরিশ্রমের মধ্যেই ছিল, অথচ তার শ্রমজাত অর্জিত সম্পদ শোষণ করে অন্য একজন সম্পদের মালিক বনে গেল। পক্ষান্তরে সে হয়ে পড়ল অধিকারহারা নিঃস্ব একজন পথের কাঙাল। কঙ্কালসার। দিনরাত পথে বসে থাকাই তার এখন কপালের লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত নিঃস্ব হওয়ার ইতিহাসটা তার বড়ই করুণ। সে হয়তো নদীভাঙা একজন। অথবা কঠিন কোনো ব্যামো তাকে পথে বসিয়েছে। হয়তো কেউ মামলা-মোকাদ্দমায় জড়িয়ে হয়েছে সর্বস্বান্ত। ভিক্ষাবৃত্তি তাকে মমত্বহীন আবহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অসহায়ত্বের পিছনে এরকম অনেক কারণ বিদ্যমান। যা মনুষ্যসৃষ্ট। হয়তো সে নিজেও তার কৃতকর্মের জন্যে দায়ী। কালস্রোতে তার সব ভেসে গেছে। অনিবার্য সত্য, সে পথে বসেছে। আমৃত্যু অসহায়ত্বের মধ্যেই সে হয়তো একদিন মৃত্যুবরণ করবে।

আমরা অনেকটা হালকাভাবে মনুষ্যত্ব, মমত্ব, মানবতা ও মহত্ত্ব এই শব্দগুলোকে জানি। কখনো কোনো হূদয়স্পর্শী ঘটনা এই শব্দগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আমাদের দারুণ আপ্লুত করে। আমরা তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে থাকি—কী মনুষ্যত্ব, কী মানবতা, কী মহত্ত্ব! সত্যই প্রশংসিত। আমরা যদি মনুষ্যত্ববোধের পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি, তাহলে ভিক্ষাবৃত্তির অবসান হতে পারে। ভিক্ষাবৃত্তি যে মানবতার অপমান তা আমরা তখন উপলব্ধি করতে পারব। মনুষ্যত্বই যে ধর্ম তখন তা বুঝতে পারব। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম মনুষ্যত্ববোধের বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণে ইসলামের ভূমিকার কথা বলেছেন। যেমন—

‘ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,

সুখ-দুঃখ সমভাগ করে নেব সকলে ভাই,

নাই অধিকার সঞ্চয়ের;

দুজনার হবে বুলন্দ নসীব,

লাখে লাখে হবে বদনসীব,

এ নহে বিধান ইসলামের।’

অস্থায়ী পৃথিবীতে সুখ-দুঃখ সমভাগ করে চলাই তো মানবতার চরম উত্কর্ষ। কারো অসহায়ত্ব ধর্মকে ধারণ করে না। তা মানবতার কলঙ্ক। একটি জনশ্রুতি এরকম, ‘দূর ফোরাতকূলে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তজ্জন্য খলিফা ওমর (রা.)-কে দায়ী থাকতে হবে।’ একটা নিকৃষ্ট জীবের বেলায় যদি এরকম নির্দেশ আমরা পাই, তাহলে সৃষ্টির সেরা মানুষের বেলায় দায়িত্বটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এটাই দায়িত্ববোধের কথা! এটাই সভ্যতা।

অথচ দুঃখজনকভাবে শোষণকারী, অপকৌশলী আর বৈষম্য সৃষ্টিকারী—ওদের সংখ্যাটা দ্রুতই বাড়ছে। শোষণের শক্ত বলয় ওরা তৈরি করে নিয়েছে। মাঝে-মধ্যে দান-দক্ষিণায় ওদের সাক্ষাত্ মেলে। হাতপাতা লম্বা লাইনের সামনে ঔদার্য জাহির করে।

কিন্তু একজন মানুষ কেন আরেকজন মানুষের কাছে চরম অসহায়ত্ব নিয়ে হাত পাতবে? এটা তো মানবতার অপমান। কোরবানির একটুকরো মাংসের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াবে, এটা সত্যই দৃষ্টিকটু। এজন্যে বলা হয়েছে, দান মানে অসহায়ত্বের অবসান হওয়া এবং স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দানবীর হওয়া নয়। অত্যন্ত গোপনেই তা করার কথা বলা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, রাষ্ট্রকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, সবাইকে জানান দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিটা বন্ধ করা হবে মহত্ কাজ। হযরত মুহম্মদ (স.) একদা এক অসহায় মানুষকে কুঠার কিনে দিয়েছিলেন। বন থেকে কাঠ কেটে লোকালয়ে বিক্রি করার জন্য তাকে বলেছিলেন তিনি। কারো কাছে যেন সে হাত না পাতে। করুণা নয়, দায়িত্ববোধ থেকে কাজটি করতে হবে। সমাজজীবন থেকে অপমানজনক এই অধ্যায়ের অবসান হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাধ্যতামূলক আইন করে হলেও সমাজের ধনী মানুষের কাছ থেকে ধার্যকৃত ন্যূনতম চাঁদার টাকায় গৌরবান্বিত এই কাজটি সম্পন্ন হতে পারে। সম্মিলিত চেষ্টার মাধ্যমে ধূলায় লুণ্ঠিত মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে আনাই হবে সুন্দর ও শুভ কাজ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজের ব্যবস্থাও এই প্রকল্পের মাধ্যমে চালু হতে পারে। তাহলেই মনুষ্যত্বের কল্যাণকর এই সমাজ হবে মমত্ববোধে উজ্জ্বল। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের একক অর্জনকারী দেশ হবে বাংলাদেশ। ভিক্ষুকশূন্য গৌরবান্বিত জাতিরাষ্ট্র হবে বাংলাদেশ। সবার সোনার বাংলা হবে বাংলাদেশ।