পুথিসাহিত্যের সংরক্ষণ ও পরিশীলন জরুরি

পুথি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ সময়ে রচিত বিশেষ ধরনের সাহিত্য। আঠারো-উনিশ শতক পর্যন্ত এর ব্যাপ্তিকাল। পুথি শব্দের উত্পত্তি ‘পুস্তিকা’ শব্দ থেকে। এ অর্থে পুথি দ্বারা যে কোনো গ্রন্থকে বোঝালেও পুথিসাহিত্যের ক্ষেত্রে তা বিশেষ অর্থ বহন করে। যুদ্ধবিগ্রহ, প্রেমকাহিনি, নবি-আওলিয়ার জীবনকাহিনি, রাজবন্দনা, মহাকাব্য, মঙ্গলকাব্য, কল্পকাহিনি, পদাবলি ছিল পুথিসাহিত্যের বিষয়বস্তু। সেই সময় কাগজ বা ছাপাখানা ছিল না বলে পুথিগুলো সাধারণত পশুর চামড়া, হাড়, গাছের বাকল, তালপাতা, কলাপাতায় লেখা হতো। ইউসুফ-জুলেখা, লাইলি-মজনু, সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল, জঙ্গনামা ইত্যাদি ছিল উল্লেখযোগ্য পুথির নাম। যারা এসব পুথি লিখতেন, তাদের শায়ের বলা হয়। পুথিসাহিত্যের রচয়িতা ও পাঠক উভয়েই মুসলমান হলেও পরে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও এর প্রচলন লক্ষ করা যায়।

সন্ধ্যা নেমে এলেই গ্রাম-বাংলায় দেখা যেত পুথিপাঠের আসর। সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে গ্রামীণ প্রান্তিক লোকেরা জড়ো হতো একটি নির্দিষ্ট  জায়গায়। মাদুর বিছিয়ে অথবা শানবাঁধানো গাছের চারদিকে গোল হয়ে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনত পুথির কথাগুলো। তাদের মধ্য থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ একজন সুর করে সবার মধ্যে পুথির আমেজ ছড়াত। কৃষক, শ্রমিক, শিশু, বনিতাসহ সর্বস্তরের লোক সুর মিলাত তার সঙ্গে। হারিকেন, মাটির প্রদীপ ও মশাল দ্যুতি ছড়াত জমজমাট এই আসরে। শায়েরগণ তাদের লেখনীতে পুথির বিষয়বস্তুগুলো ফুটিয়ে তুলতেন ঠিক এভাবে—

শোন শোন বন্ধুগণ শোন দিয়া মন

কমলা সুন্দরীর কথা করি যে বর্ণন

হিরন নগরের মেয়ে কমলা সুন্দরী

গুণের কথা কী কহিব রূপ ছিল তার ভারী....

এমন সুর-তাল-ছন্দের মিশ্রণে রচিত পুথিসাহিত্যগুলো গ্রামীণ লোকের কাছে ছিল যেন অমৃততুল্য। পুথিপাঠ গ্রামীণ লোকদের যে শুধু বিনোদন দিত তা নয়, সাহিত্যচর্চার অন্যতম মাধ্যমও ছিল এই পুথিসাহিত্য। পুথিপাঠের আসরে আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে গড়ে উঠত ঐক্যবদ্ধ  মনোভাব ও ভ্রাতৃত্ব। শহরের রাজদরবারে, জ্ঞানী-গুণীদের আড্ডাখানায় ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পুথির চর্চা চলত অবিরতভাবে।

কালের বিবর্তনে এবং আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে পুথিসাহিত্যের ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। চিত্তচাঞ্চল্যময়ী উনযৌবনা পুথিসাহিত্য যেন জরাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছে, যারা পুথিসাহিত্য কি; বাংলা সাহিত্যে এর অবদান সম্পর্কে অবগত নয়। একজন খাঁটি বাঙালি হিসেবে আমাদের সবাইকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখা দরকার। আর এ জন্যই পুথি সংরক্ষণের দিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশে পুথিসংগ্রহের জন্য ১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পুথিসংগ্রহ সমিতি’ গঠিত  হয়। ঢাকা জাদুঘরের কিউরেটর নলিনীকান্ত ভট্টাশালী এই সমিতির সম্পাদক হিসেবে প্রায় ১৭ হাজার পুথি সংগ্রহ করেন। এর বাইরেও বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোথাও না কোথাও জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়ে আছে  আরো অনেক পুথিসাহিত্য, যা এখনো তালিকাভুক্ত করা হয়নি। বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ  গ্রহণ করে পুথিগুলো সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, ব্যাপক চর্চা ও প্রচুর গবেষণা করতে হবে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে পুথিচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য তাদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে মিল রেখে নতুন করে পুথি রচনা করতে হবে। এতে করে জরাগ্রস্ত পুথিসাহিত্য তার যৌবন ফিরে পাবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়