বিশ্বব্যাপী ই-কমার্সের মাধ্যমে কেনাকাটা করার জনপ্রিয়তা গতানুগতিক হারে বেড়েই চলেছে। ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্য হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক একটি ব্যবসা পদ্ধতি, যেখানে কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহক ও উদ্যোক্তা উভয়েই পণ্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয় করে থাকেন। বর্তমানে বাংলাদেশেও এটির ব্যাপক বিস্তার লক্ষ করা যায়। তবে করোনাকালীন এটি অধিক হারে পরিচিতি লাভ করেছে দেশজুড়ে। পূর্বে নগরভিত্তিক অনলাইন কেনাকাটার প্রভাব লক্ষ করা গেলেও বর্তমানে গ্রামেগঞ্জেও এটি বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে মানুষের জীবনযাত্রার জন্য আবশ্যক সব পণ্য বা সেবা পাওয়া যাচ্ছে ই-কমার্সের মাধ্যমে। ব্যস্ত নগরবাসীকে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে যেতে হচ্ছে না কোনো মার্কেটে। ঘরে বসেই তারা তাদের পছন্দের পণ্য ও কাঙ্ক্ষিত সেবা ক্রয় বা গ্রহণ করতে পারছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের ই-কমার্সের লেনদেন ছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আংকটাডের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ই-কমার্স খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন দেখে বিদেশি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ই-কমার্সে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে, যার মধ্যে অ্যামাজন, আলিবাবা ও কিউভি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের জন্য এটি ইতিবাচক এবং সম্ভাবনাময় একটা দিক। এর ফলে বাংলাদেশে প্রচুর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং ছোট ছোট উদ্যোক্তারা বিশ্ববাজারে স্থান করে নিতে পারবে। কিন্তু কিছু অসাধু ও অসত্ চক্র গ্রাহকদের নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে তাদের প্রতারিত করছে।
ইদানীং ই-কমার্সের কিছু সাইটের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগও উঠে এসেছে। ক্রেতাদের ভাষ্যমতে, তারা পণ্যের অধিক মূল্য চাইছে, এক ধরনের পণ্য দেখিয়ে আরেক ধরনের পণ্য সরবরাহ করছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করছে, পণ্য সরবরাহ করতে সময়ক্ষেপণ করছে, অগ্রিম টাকা নিয়ে ব্লক করে দিচ্ছে, চাহিদামাফিক পণ্য না পাওয়ার পরও টাকা রিফান্ড করছে না তারা। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান লোভনীয় অফার, দ্বিগুণ ক্যাশব্যাক এবং চটকদার বিজ্ঞাপন দেখিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। বাংলাদেশে ২০১৪ সালের পর থেকে ই-কমার্স জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ছোট-বড় সব ধরনের প্রতিষ্ঠানই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে মাঠে নেমে পড়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর গচ্ছিত সম্পদ এবং দেনার পরিমাণটাও লক্ষ করা অত্যাবশ্যক। কারণ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দেনার পরিমাণ প্রতিষ্ঠানটির গচ্ছিত সম্পদের তুলনায় বেশি হয়ে গেলে ক্রেতার মানসম্মত পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সম্প্রতি ইভ্যালি, ধামাকা ও ই-অরেঞ্জ নামক ই-কমার্সের তিনটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ব্যাপক সমালোচনায় এসেছে। গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলে প্রতারিত করার অভিযোগ উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠান তিনটির বিরুদ্ধে। কোম্পানিগুলো চমকপ্রদ অফার দিচ্ছে বিভিন্ন পণ্যের ওপর এবং তারা ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক অফারও দিচ্ছে। তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে কোনো কোনো গ্রাহককে দীর্ঘদিন পর নামমাত্র পণ্য সরবরাহ করছে, কিন্তু বেশির ভাগ গ্রাহকই পণ্য না পাওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন। তারা যাদের থেকে পণ্য এনে ব্যবসা করছে, তাদের পাওনা টাকাও ঠিকমতো পরিশোধ করছে না। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করছেন গ্রাহকেরা। কেউ কেউ নিজের সর্বস্ব হারাতে বসেছেন এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাস রেখে। অনেক গ্রাহক প্রথম দিকে স্বল্প পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে সঠিক সময়ে তাদের পণ্যটি পেয়ে গেছেন। এরপর ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা তৈরি হলে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে ফেলছে। সব থেকে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে তরুণ মোটরসাইকেল ক্রেতারা। লাখ লাখ তরুণ মোটরসাইকেল কেনার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেছে। কারণ মোটরসাইকেলে তারা দিয়েছিল বিশাল ছাড়। দ্বিগুণ লাভে তারা সেই মোটরসাইকেল বিক্রির আশায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাঁদে পা বাড়ায়। অধিক হারে ঋণগ্রস্ত হওয়ায় ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। গ্রাহকেরা এখন তাদের অর্ডারকৃত পণ্যের ডেলিভারি চাইছেন অথবা অগ্রিম পরিশোধিত টাকা ফেরত চাইছেন। এভাবে অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার জন্য হুমকির মুখে পড়ছে গোটা ই-কমার্স ব্যবস্থা। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং ই-কমার্স খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে মানুষ অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। তাই ই-কমার্সকে নির্ভরযোগ্য করে তুলতে হলে সঠিক ও সুকাঠামো আইন ও নীতিমালা প্রয়োগ জরুরি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়