তালেব রানা
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে আবারও আফগানিস্তানের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান। এরপরই কাবুল বিমানবন্দর থেকে বিদেশি নাগরিক ও সেনাদের সরিয়ে নিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ। গতকাল রবিবার কাবুল থেকে সব ব্রিটিশ সৈন্য, কূটনীতিবিদ ও কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে ব্রিটেন। ডাউনিং স্ট্রিট নিশ্চিত করেছে যে, রয়্যাল এয়ারফোর্সের সবশেষ বিমানটির প্রস্থানের মধ্যে দিয়ে আফগানিস্তান যুদ্ধে ব্রিটেনের ২০ বছরের সংশ্লিষ্টতার অবসান হয়েছে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রেরও কাবুল থেকে সেনা, নাগরিক ও কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছে। আর এই প্রেক্ষাপটে কাবুল বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে তালেবান।
কাবুল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে বিদেশি নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা বাড়াতে অনেক পশ্চিমা দেশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু বাইডেন প্রতিশ্রুত সময় অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। কাবুল বিমানবন্দর থেকে বিদেশিদের সরিয়ে নেওয়ার সময় যে ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য অনেকেই বাইডেনের সিদ্ধান্তকে দায়ী মনে করছেন। এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার কাবুল বিমানবন্দরের কাছে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ১৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঐ হামলায় নিহত হয়েছেন ১৩ মার্কিন সেনাও। আহত হয়েছেন বেশ কয়েক জন মেরিন সেনা।
জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট গ্রুপের স্থানীয় শাখা- ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসান প্রদেশ (আইএস-কে) ঐ হামলার দায় স্বীকার করেছে। পালটা জবাব হিসেবে শুক্রবার আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে শীর্ষস্থানীয় দুই জন আইএস-কে নেতাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই দুই জন ব্যক্তি পরিকল্পনাকারী ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী বলে বর্ণনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কাবুল বিমানবন্দরে হামলার সঙ্গে তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন কি না, তা পরিষ্কার নয়। শনিবার এক বিবৃতিতে জো বাইডেন বলেন, এই (ড্রোন) হামলাই শেষ নয়। জঘন্য ঐ হামলার সঙ্গে যে ব্যক্তি জড়িত থাকুক না কেন, তাদের খোঁজ আমরা চালিয়ে যাব এবং উপযুক্ত শাস্তি দেব।
যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আফগানিস্তান থেকে সেনা ও বেসামরিক লোকদের সরিয়ে নিচ্ছে তা অনেকেই ভিয়েতনামের সায়গন থেকে মার্কিন সেনা সরানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আইএস-কে জঙ্গিরা। শনিবারও মার্কিন প্রশাসন কাবুল বিমানবন্দরের আশপাশে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে সতর্কতা জারি করে। সতর্কতা জারি করে তালেবানও। বিমানবন্দরের আশপাশে আরো কয়েক স্তরের তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে তালেবান। বেশির ভাগ আফগানকে তারা এসব চেকপোস্ট পার হতে দিচ্ছে না।
আফগানিস্তানের সবচেয়ে চরমপন্থি ও সহিংস জঙ্গি গ্রুপ হচ্ছে আইএস-কে। আফগানিস্তানের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী তালেবানের সঙ্গে তাদের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা করে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেছে তালেবান।
হিন্দুস্তান টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারকে একটি রক্তাক্ত প্রদর্শনীর রূপ দিয়েছে আইএস-কে। এর মাধ্যমে এই জঙ্গি সংগঠন একটি বার্তা দিয়েছে যে, আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবান বা পশ্চিমারা যেই থাকুক না কেন আফগানিস্তান তাদের লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে থাকবে। মার্কিন মিলিটারি একাডেমির সহকারী অধ্যাপক আমিরা জাদুন সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে আইসিস-কে-এর মতো জঙ্গি সংগঠনকে স্বাধীনভাবে কর্মকাণ্ড চালাতে এক ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা সেটিই দেখছি। আইএস-কের এখন উদ্দেশ্য হচ্ছে স্থিতিশীলতা নষ্টের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং আফগান তালেবানের বিশ্বাসযোগ্যতা খর্ব করা।
আরব অঞ্চলের একটি দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর হামলা করছে আইএস-কে। কাবুল বিমানবন্দরের হামলা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আফগানিস্তানের জন্য খুবই রক্তাক্ত ভবিষ্যত্ অপেক্ষা করছে।
জাতিসংঘের এক হিসাব অনুযায়ী আইএস-কের ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ২০০ সক্রিয় যোদ্ধা রয়েছে আফগানিস্তানের কোনার এবং নানগরহার প্রদেশে। এছাড়া সারা দেশে ছোট ছোট বিক্ষপ্ত সেল ছড়িয়ে রয়েছে। গত মার্চে শিক্ষাবিদ আমিরা জাদুনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ৪৭টি জঙ্গি হামলার দায় স্বীকার করে সংগঠনটি। যা ২০১৭ ও ২০১৮ সালের হামলার তুলনায় চেয়ে বেশি। আমিরা জাদুনের মতে, আফগানিস্তানের এই অস্থির পরিবেশের বহুমুখী সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় আইএস-কে সংগঠনের হুমকি মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে তালেবান থেকে যাতে কেউ আইএস-কেতে যোগ না দেয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আর কোনার এবং নানগরহার যাতে তাদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত না হয় সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে আফগান কর্তৃপক্ষকে।