আফগানিস্তান পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

ভয়াবহ আর জটিল পরিস্থিতি। আফগানিস্তানের উত্তরে লাগোয়া প্রদেশগুলিতে আহমদ মাসুদের নর্দান অ্যালায়েন্স ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, নানা প্রান্তে তালেবানের ওপর জবরদস্ত আঘাত হানছে। কাবুল থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরের হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণিঘেঁষা মনোহর পঞ্জশির তার আবহমান লড়াই আর দুঃসাহসের ঐতিহ্য জাগ্রত রেখে ঘোষণা করেছে, সভ্যতা আর মানবতার বীভত্স শত্রুর হাতে সূচ্যগ্র মেদিনীও ছাড়বে না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতে হবে, পঞ্জশিরের লাগোয়া আন্দারাব আর বাগলান প্রদেশে অ্যালায়েন্স বাহিনীর হামলায় ৩০০ তালেবানের মৃত্যু তাজিক যোদ্ধাদের ঘোষিত অঙ্গীকারকে নতুন শক্তি জোগাল। তালেবানও চারদিক থেকে পঞ্জশিরকে ঘেরাও করার চেষ্টা করছে। বাগলান আর পুল-এ-হিসারে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মরিয়া। যুদ্ধ আর গৃহযুদ্ধের দিশেহারা, রক্তাক্ত আবহে সত্য আর অতিরঞ্জনের ফারাক বোঝা যায় না। সব পক্ষই হুংকার দেয়। আফগানিস্তানেও ব্যতিক্রম নেই। কাবুল, কান্দাহার, মুলতান আর পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী পশতুন অঞ্চলসহ গরিষ্ঠসংখ্যক প্রদেশগুলি তালেবানের দখলে। ভেতরের প্রতিরোধ দুর্বল। দুর্বলকে ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে, চোখের সামনে অপ্রতিরোধ্য খড়্গ ঝুলিয়ে যারা দাবিয়ে রাখতে চাইছে, আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাদের পাশে নেই। থাকবে না। দ্বিতীয়ত আর্ন্তজাতিকে চাপ যত বাড়বে, ভেতরের প্রতিরোধ, বিশেষ করে নর্দান অ্যালায়েন্সের আক্রোশ ততটাই সুবিধাজনক অবস্থার দিক মোড় নেবে।

পঞ্জশিরের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে অক্ষত রাখবে। হ্যাঁ চীন, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তান যদি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সে হবে ভিন্নতর রূপান্তর এবং গোটা আফগান মুলুক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতার, রক্তক্ষয়ের ময়দান হয়ে উঠবে।

পঞ্জশির নদী আর দুর্ভেদ্য পঞ্জশির পর্বতশ্রেণি, পঞ্জশির উপত্যকাকে আফগানিস্তানের অন্যান্য এলাকা থেকে আলাদা করে রেখেছে। একই দেশের, একই রাজনৈতিক মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও স্বতন্ত্র তার জনবিন্যাস, সংস্কৃতি ও জাতি পরিচয়ের সামনে বহিরাগতের আকাঙ্ক্ষা এক দুঃস্বপ্ন। মধ্য এশিয়ার মোগল, পশ্চিম এশিয়ার আরব ও উপসাগরীয় পারস্য রাজশক্তি এ অঞ্চলের পার্বত্য জনগোষ্ঠীকে কখনো পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে পারেনি। ব্রিটিশও তাদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। উনিন শো আশির দশকে কমিউনিস্টদের উত্থান, সোভিয়েত রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপকে পঞ্জশির আটকে দিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চল আল-কায়েদায় মদতপুষ্ট তালেবান সরকারের সবচেয়ে বড় শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। তালেবান সরকারের পতনের পর আমেরিকাও ঢুকতে পারেনি গিরিশ্রেণি অধ্যুষিত তাজিক যোদ্ধাদের এলাকায়।

আহমদ মাসুদের বাবা আহমদ শাহ মাসুদ পঞ্জশিরের জাতীয় বীর। ১৯৭৩ সালে, গণপ্রজাতন্ত্রী আফগানিস্তানের সূচনাপর্বে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ বছর বয়সি ছাত্র শাহ মাসুদ ছিলেন জামাত-এ-ইসলামির ছাত্র শাখার অন্যতম নেতা। দাউদ খানের কমিউনিস্টদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তার রাজনৈতিক উত্থানের শুরু। পরে তার মতাদর্শের কতটা বদল ঘটেছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। 

কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে আহমদ শাহ গেরিলাবাহিনী গঠন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন, কমিউনিস্টদের পতনের  পর ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তাকে হত্যা করে আল-কায়েদার জঙ্গিরা, এর দুদিন পরেই মার্কিন বাণিজ্যে বীভত্স হামলার ঘটনা ঘটল—এসব ঘটনা প্রমাণ করে, আহমদ শাহ তার রাজনীতির অবস্থান বদলে তাজিক সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। একসময় পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হলো তার—এ অবস্থানকে ঘোষিতভাবেই মান্যতা দিয়েছেন তার ছেলে আহমদ মাসুদ (৩২)। বলেছেন, ‘আমার বাবার ভাবমূর্তিকে সামনে রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যাব।’ তার সহযোগী আর প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ সালেহ ঘোষণা করেছেন, ‘তিনিই ন্যায়সংগত তদারকি প্রেসিডেন্ট।’ তার এই বিবৃতি সংশয় তৈরি করছে। আহমদ মাসুদ সালেহকে প্রেসিডেন্ট মেনে নেবেন বলে মনে হয় না। বরং মাসুদ চাইবেন, বৃহত্তর সরকার এবং ক্ষমতার দ্রুত হস্তান্তর। এটা কি সম্ভব? মনে হয় না। তালেবানের সম্পূর্ণ উত্খাত ব্যতিরেকে নতুন ক্ষমতায় বিন্যাস এক কথায় দুষ্কর।

ধরা যাক, খানিকটা মধ্যমপন্থি বারাদরকে নিয়ে তালিবান নতুন সরকার গড়ার উদ্যোগে আরো সক্রিয় হয়ে উঠল। ক্ষমতার রাশ থাকল কট্টরপন্থি ও জামায়াত অনুসারী মাওলায়ি হিবাতুল্লাহ আখুনজাদার হাতে, যিনি তালেবানের ঘোষিত আমির। যাকে পরামর্শ দেবে মজলিসে শুরা (উপদেষ্টা পরিষদ) এবং আক্ষরিক অর্থে যে সরকার হবে উগ্রপন্থার রাজনৈতিক রূপান্তর। এমন এক পরিকল্পিত সরকারের সমর্থক হয়েও কি পশতুন রক্তের হিবাতুল্লাহ ও বরাদরের নেতৃত্বেকে মেনে নেবেন গুলবদন হিকমতিয়ার, হক্কানি গোষ্ঠী, মোল্লা ওমরের উত্তরাধিকারী ও অন্যান্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিকরা।

হক্কানিরা আল-কায়েদার ভাবাদর্শে পরিচালিত। হিবাতুল্লাহ কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রকাঠামোগত দিক থেকে জামায়াতপন্থি। বিভিন্ন জাতি, উপজাতি ও মতাদর্শনির্ভর এসব নেতৃত্বকে একই ছত্রছায়ায় সমবেত করে সরকার গড়া সহজসাধ্য নয়। হলে, কাবুল দখলের দিন কয়েকের মধ্যে তালেবানের সরকার গড়ে উঠত এবং বিরোধী গোষ্ঠীগুলি এত দ্রুত প্রত্যাঘাতের সুযোগ পেত না। তার মানে, পরিস্থিতি বিলকুল তালেবানের অনুকূলে নয়, বরং ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং এ কারণেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। বাড়ছে হিংসা, প্রতিহিংসা আর সশস্ত্র প্রতিরোধ। হিংসার রাজনীতি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের কাশ্মীরেও নতুন অগ্নিসংযোগ শুরু করবে, এরকম আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া অবাস্তব। অবান্তর।

২২ আগস্ট কাবুলে হাজির হয়ে গেলেন পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী শাহ মহম্মদ কোরেশি। তাদের প্রত্যাশিত আফগান সরকারের হবু প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার কী কী কথা হয়েছে, তা আমাদের জানার বাইরে। আর সেদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, আফগানিস্তান নিয়ে, ২৬ আগস্ট, সর্বদলের বৈঠক ডাকলেন। মোদি বুঝিয়ে দিলেন, আফগান পরিস্থিতি নিয়ে ভারত চুপ করে থাকতে পারে না। ভারতের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তালেবান সদয় নয়। বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করেছে। তবে জানা মতে, এ ব্যাপারে ভারত ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে। দ্বিতীয়ত, তাদের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হবে, তারা পাকিস্তানের ইঙ্গিতে  কাশ্মীরকে আরো উত্তপ্ত করে দেবে। তৃতীয়ত প্রতিরোধের নামে আফগান মুলুকে অত্যাচার, ব্যক্তিহত্যা আরো বাড়িয়ে দেবে। এরকম পরিস্থিতিতে পশ্চিমি ব্লকের সঙ্গে ভারতকেও সরব হতেই হবে। প্রতিবেশী বাংলাদেশ এখন নিশ্চুপ। কিন্তু তার চাপা উদ্বেগ অহেতুক নয়। খালেদা জিয়ার জামানায় যেভাবে অতি উত্সাহী, অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু শক্তি স্লোগান তুলেছিল, আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান, তারা এখনো শেষ হয়নি। সুযোগ পেলেই বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল উঁচিয়ে ধরবে। পশ্চিমি শক্তিবর্গের বাধ্যবাধকতাও মনে রাখা জরুরি। কেননা, রাশিয়া, চীন, ইরান ও তুরস্কের মনোভাব বদলাচ্ছে। কূটনীতির নতুন সমীকরণ নতুন চেহারা নিচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সোমবার জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সঙ্গে কথা বলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ফোনে আলাপ করেছেন। মঙ্গলবার জি-৭-এর বৈঠক ডেকেছেন বরিস জনসন। এসব তোড়জোড় প্রমাণ করছে, পশ্চিমি ব্লক আর ভারত এক সুরে কথা বলবে।

আরব-বিশ্ব এখনো নীরব। তাদের উদ্বেগ অন্যত্র। তালেবান ক্ষমতায় এলে ছত্রভঙ্গ আইএসও আল-কায়েদা আবার জড়ো হবে। তাদের সহযোগী হয়ে উঠবে ইরানের মদতপুষ্ট হিজবুল্লাহ। এবং আরব দুনিয়ার অস্ত্রবিপ্লব পাচার করবে, যা ইসলাম আর ইসলামি জগেক আরো বেশি বিড়ম্বিত করে দেবে। ধর্মের নামে রক্তক্ষয়, যুদ্ধ, নরহত্যা, ধ্বংসকে ইসলাম প্রশ্রয় দেয়নি। অস্ত্রের জোরে নয়, বাণিজ্যিক বিকাশকে স্পর্শ করে পশ্চিম এশিয়া থেকে আফ্রিকা, মধ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত হয়েছে তার নাগরিক ও লোকায়তিক সভ্যতা। তার গায়ে উগ্রপন্থার আধিপত্য স্থাপিত হোক, বেড়ে উঠুক ইসলামো ফোবিয়া—আরব বিশ্ব তা চায় না, চায় না সভ্যতার বিকশিত দুনিয়া।  

n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা