যুগে যুগে বাংলায় সমাজ সংস্কার ও সংস্কৃতি সুরক্ষায় প্রথিতযশা ব্যক্তিগণ বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। আধ্যাত্মিক প্রচারক হিসেবে যিনি সমগ্র বিশ্বে সমাজ সংস্কার ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রচার করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ।
১৯৬৫ সালে ৭০ বছর বয়সে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রচারের লক্ষ্যে আমেরিকায় পাড়ি জমান তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকায় তখন হিপ্পি আন্দোলন শুরু হয়েছে। সেসময় শ্রীল প্রভুপাদ নিউইয়র্কের টমকিনস্ স্কয়ার পার্কে প্রথম প্রচারকার্য শুরু করেন। সেখানকার লক্ষ্যভ্রষ্ট যুবরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর অমৃত কথা শ্রবণ করতে থাকে। ধীরে ধীরে তারা তাদের বদভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করে পরম আনন্দ অনুভব করতে শুরু করে। নিউইয়র্কের ২৬, সেকেন্ড অ্যাভিনিউয়ে ম্যাচলেস গিফট (অনুপম উপহার) নামের একটি দোকানঘরে শ্রীল প্রভুপাদ সাপ্তাহিক অধিবেশন শুরু করেন। ধীরে ধীরে আমেরিকানরা বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। শ্রীল প্রভুপাদ ৭০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন।
১৯৬৬ সালেই শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা দ্বারা আধুনিক সভ্যতার ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে পেরেছিলেন। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সুবিস্তৃত ভূমিতে ইকোভিলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা তিনি বিশ্ববাসীকে একটি মডেল হিসেবে দেখিয়েছেন। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা UNWTO কর্তৃক ইসকনের ইকোভিলেজ প্রকল্পকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের জন্য শ্রীল প্রভুপাদ নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তার মধ্যে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ ও চিকিত্সা প্রদান কর্মসূচি অন্যতম।
শ্রী চৈতন্যদেবের অহিংস নীতি ও সাম্যবাদের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত তাঁর সংস্থায় শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই যুক্ত হতে পারেন। তিনি বিশ্বব্যাপী দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে বৈদিক দর্শন ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে মতবিনিময় করেন। তত্কালীন জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটলস্-এর স্বনামধন্য তারকা জর্জ হ্যারিসন, বিখ্যাত ফোর্ড কোম্পানির উত্তরাধিকারী আলফ্রেড ফোর্ডসহ বহু বরেণ্য ব্যক্তি তাঁর আদর্শের অনুসারী। শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত জর্জ হ্যারিসন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত তাঁর নিজ বাড়িটি আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য দান করেন। প্রভুপাদের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ভক্তিবেদান্ত মেনর।
১৮৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। ছাত্রাবস্থায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন।
অক্ষয় লীলামাধব দাস