‘এখনকার অনেক নির্মাতাই শিল্পী বা ক্যামেরাম্যান নির্ভর’

নির্মাণে বরাবরই মুন্সিয়ানার পরিচয় দেন নির্মাতা মোহন খান। তার প্রায় নাটকই দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। ধারাবাহিক নাটক নির্মাণে যেখানে বেশিরভাগ নির্মাতা খেই হারিয়ে ফেলেন সেখানেও ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করেছেন তিনি। নিজের নির্মাণ ও ইন্ডাস্ট্রির নানা বিষয়ে তিনি কথা বললেন ইত্তেফাকের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল

বর্তমান কাজের ব্যস্ততা নিয়ে জানতে চাই—

‘নীড় খোঁজে গাংচিল’ শিরোনামের একটি ধারাবাহিকের কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। এরইমধ্যে নাটকটির ৯৪০ পর্ব প্রচারিত হয়েছে। ১ হাজার পর্বের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

দেশের নির্মাতারা এ ধরনের নাটকে ধারাবাহিকতা রক্ষায় বরাবরই ব্যর্থ। সেই জায়গায় আপনি কীভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রাখছেন?

আসলে আমি মনে করি, প্রফেশনালি এগিয়ে গেলে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের এখনো সেভাবে প্রফেশনালিজমটা তৈরি হয়নি। ফলে প্রথম দু-তিনটি পর্ব নির্মাতা-শিল্পী যত্ন নিয়ে করলেও পরে আগ্রহ কমে যায়।

নাটকের নির্মাণের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে মান নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। একজন সফল নির্মাতা হিসেবে এ নিয়ে কী মন্তব্য করবেন?

অতিরিক্ত কাজ করলে মান একটু কমবেই। এর মাঝেও ভালো নাটক হচ্ছে না, তা না। অনেকেই বিটিভির নাটকগুলোর কথা বলেন। সেই সংখ্যা কিন্তু কমই ছিল। তবে এটাও সত্য যে, এখন নাটক বেশি হলেও সেই তুলনায় ভালো কাজ কম হচ্ছে।

নাটক এখন বাণিজ্যিক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী বলে মনে করেন?

এই কথাটি সত্য। বেশিরভাগ টেভি চ্যালেন সেই মানের লোক দিয়ে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে না। বিজ্ঞাপনের কারণে তারা এজেন্সি নির্ভর হয়ে গেছে। তবে এখানে নির্মাতাদের কোনো ভূমিকা নেই। চ্যালেনগুলো যদি চায় যে, ভালো লোক দিয়ে নাটকগুলো প্রিভিউ করে মানসম্মত কাজগুলো নেব, তাহলে এই অবস্থা থেকে বের হতে সময় লাগবে না।

নাটকে চরিত্র সংকটও কিন্তু দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে একটি গল্প সঠিকভাবে তুলে ধরা কতটা সম্ভব হচ্ছে?

এখনকার শহর কেন্দ্রিক গল্পে পরিবার নেই, গ্রাম্য গল্পে গ্রাম নেই! দর্শকদের একটু হাসাতে বা টিআরপি বাড়াতে ভাঁড়ামো করা হচ্ছে। এতে করে একটি গল্প সঠিকভাবে উঠে আসছে না। এভাবে চলতে থাকলে সমাজে বাজে প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি আমাদের সম্মানের জায়গা কমে যাচ্ছে।

নাটকের মাধ্যমে ভাষাকেও বিকৃত করা হচ্ছে। এতে মানুষের কাছে আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল বার্তা পৌঁছাচ্ছে না?

এখন এক নাটকে অনেক আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি যে ধরনের অশ্লীল ডায়ালগ ব্যবহার করা হচ্ছে, এটা কিন্তু আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। আবার অনেক নাটকের নামই ইংরেজিতে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দর্শক বাঙালি, ভাষা বাংলা, সেখানে ইংরেজি নাম কেন আসবে! এখানে একটু কঠোর হওয়া দরকার নাটক সংশ্লিষ্ট সংগঠনের।

এখন ভিউ গুনে নাটকের মান ও স্টার নির্ধারণের চর্চা চলছে। এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আমরা যখন শুরু করেছিলাম তারা সবাই শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। তাদের কথা-বার্তা, আচার-আচরণ, পেশাদারিত্ব অনেক ভালো ছিল। কিন্তু এখন সেই বিষয়টি নেই। এভাবে চলতে থাকলে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মানুষটিও আপনি খুঁজে পাবেন না।

কাজ না জানা অনেককেই নির্মাণ ও অভিনয়ে দেখা যায়। এতে নাটক সৃজনশীলতা হারাচ্ছে না?

আসলে কোনো প্রক্রিয়া ছাড়া কাজে এলে এমন অবস্থা তৈরি হবেই। এখনকার অনেক নির্মাতাই শিল্পী বা ক্যামেরাম্যান নির্ভর। ভালো কোনো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করে আসেননি। শিল্পীরাও মঞ্চে কাজ না করে বা অভিনয় না শিখেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

ওটিটি নিয়ে অনেকেই আশা প্রকাশ করছেন। কিন্তু অল্পদিনেই সিন্ডিকেটের কথা শোনা যাচ্ছে। এতে করে আপনাদের সুযোগ কেমন দেখছেন?

এই মাধ্যমটিতে আমাদের অপার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমাদের সব মাধ্যমই এই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে। শুরুতে কিন্তু কিছু কাজ নিয়ে নেতিবাচক আলোচনাও হয়েছে। টিভি নাটকের মতো সিন্ডিকেটের কবলে পড়লে সম্ভাবনার দ্বার বন্ধ হতে সময় নেবে না। তবে আমার মনে হয় কর্তৃপক্ষ একটু কঠোর সিদ্ধান্ত নিলে ভালো কিছু হবেই।