আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠুন

একজন সফল নারীর সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় পুঁজি হচ্ছে নিজের আত্মবিশ্বাস। নারী কখনও মা, কখনও ঘরনি, কখনও কর্মী, কখনও সংসার কর্ত্রী। নিজের আত্মবিশ্বাসে নিজেকে এগিয়ে রাখার জন্যই একজন নারী তার দৈনন্দিন জীবনের এই সকল চরিত্রেই সমান পারদর্শী হয়ে উঠে। নিজেকে ভালো রাখার পাশাপাশি অন্যদের জীবন করে তুলছেন আনন্দময়। এমনই হন একজন আত্মবিশ্বাসী নারী। লিখেছেন সাবেরা সুলতানা

সুমনার বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। কয়েক বছর সংসার করার পর এখন চাকরির প্রতি আগ্রহী হয়েছে। সেই লক্ষ্যেই চাকরি খুঁজতে গিয়ে সুমনা একটা প্রাইভেট ফার্মে নতুন চাকরি পেয়েছে ইতোমধ্যেই। তাই এখন সুমনার দৈনন্দিন ব্যস্ততাও বেড়েছে অনেকাংশে। বাড়ির কাজগুলো দ্রুত শেষ করে এখন তাকে ছুটতে হচ্ছে অফিসের উদ্দেশ্যে। কিন্তু অফিসের কাজে তাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেক সময় জানা কাজও তার মধ্যে বিশৃঙ্খলভাবে ধরা দিচ্ছে। ঘাটতি দেখা দিচ্ছে আত্মবিশ্বাসের। কিন্তু সে জানে প্রত্যেকটা কাজের মধ্যেই আত্মবিশ্বাস থাকাটা খুবই জরুরি। আত্মবিশ্বাসের অভাবে অনেক ব্যক্তিই তার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সফলতাকে ছুঁতে পারেন না। দেখা যায় কাজটি করতে গিয়ে বারবার ভুল হচ্ছে। সে জন্য হাজারবার সংশোধন হয়েও নিজেকে সেই ভুলের গণ্ডি থেকে বের করে আনতে পারছেন না। এ জন্য পেশাগত ক্ষেত্রে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেকে সেই কাজের জন্য পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে নিজে অযোগ্য বলেও বিবেচিত হতে হচ্ছে বেশির ভাগ সময়ই। কিন্তু আপনি জানেন এই কাজটা আপনার দ্বারা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে অনেকে ভাগ্যের দোহাই দিয়েও নিজের আত্মবিশ্বাসের অভাব দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। আসলে প্রকৃত কথা হচ্ছে, এখানে ভাগ্য বা অন্য কিছু নয়, শুধুই আত্মবিশ্বাসের অভাব কাজ করছে। সে জন্য প্রথমেই বলে রাখি, নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনাই কিন্তু আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ, এর ঘাটতি মেটাতে হলে নিজের পরিকল্পনাগুলোকে আরেকবার দেখে নেওয়া বা বিশ্লেষণ করাই প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত। কোনোরূপ মন্তব্যে রিঅ্যাক্ট করার আগে একবার মনে মনে কাঁটাছেড়া করে নেওয়া সবচেয়ে ভালো দক্ষতা হতে পারে আপনার জন্য। নিজের কাজগুলোকে যুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন। মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে নেতিবাচক হয়ে উঠা মুশকিল। কাজের জায়গায় যেসব সহকর্মীরা তুলনামূলক ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন, তাদের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ তৈরি করলেই বেশি ভালো হয়। কারণ তাদের কাছ থেকে পরামর্শ চাইলে আপনার অফিসের নানা সমস্যার সমাধান তারা পজিটিভলি দিতে পারবে। দেখা যাবে এটা আপনাকে আপনার অনুকূল চিন্তাশক্তি বাড়িয়ে আপনাকে পরোক্ষভাবে ইতিবাচকতার দিকে টেনে নিয়ে যাবে। এর ফলে কাজের উত্সাহও বৃদ্ধি পাবে। সমালোচনাপ্রিয় লোকজনকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। মন সুস্থ না হলে অন্যান্য উদ্যোগ কিছুতেই ইতিবাচক হতে পারে না। যখন আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নিজের মধ্যে তৈরি হবে তখনি নিজেকে নিজে সাহস দেওয়া খুব ভালো ফলাফল দিতে পারে। সে জন্য প্রতিদিন অন্তত একবার বলা যেতে পারে, ‘আমি বিশ্বাস হারাবো না।’ এই এক লাইনের কথাটাই আপনাকে নতুনভাবে সাহস জোগাতে পারবে। কাজের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস আনতে কাজগুলো গুছিয়ে করাটা খুবই জরুরি। সে জন্য কাজের সময় এবং কাজগুলোকে একটা ডায়েরিতে বা কম্পিউটারে সাজিয়ে লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারেন। বা কাজে বেশি ভুল হয় তবে উপর একটা চেক লিস্ট তৈরি করে ফেলুন। একটা কাজ শেষ হলেই তা লাল কালি দিয়ে কেটে দিন। কাজ ঠিকমতো শেষ হলে নিজেকে ছোট একটা ট্রিট দিন। ছোট ছোট কাজগুলো আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার ক্ষেত্রে খুবই উপকারী। সে জন্য ছোট ছোট কাজগুলো কখনই অবহেলা করা উচিত নয়। ছোট ছোট কাজগুলোর ক্রমধারার সফলতা আপনার আত্মবিশ্বাস মজবুত করে ক্রমহারে। আর এই আত্মবিশ্বাসগুলোই আপনাকে ভালো কাজের দিকে মোটিভেট করে নিয়ে যাবে। নিজের মধ্যে পজিটিভ অনুভূতিটা কখনই কমতে দেওয়া যাবে না। সারাদিনের অফিসের কাজগুলোকে বাড়ি ফেরার পথে ভাবা যেতে পারে। ভুল করা কাজগুলোকে বড় আকারে না দেখে সফল কাজগুলোকে নিয়ে বেশি ভাবুন। যে কারণে সাফল্য এসেছে সে কারণগুলো অন্যান্য কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। দেখবেন নতুন কাজে উত্সাহ বাড়বে। অফিসে একা একা না থেকে সবার সাথে মিশুন। হাসিখুশি হয়ে আলাপ করলেও কাজের মধ্যে গতি তৈরি হবে। সে অবস্থায় অফিসে না থাকলে কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখা সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে।

বাড়িয়ে তুলুন আত্মবিশ্বাস

প্রতিটি মানুষের জীবনেই নানা সময়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে তরুণ বয়সে যখন স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতেও অনেককে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়, তখন এই আত্মবিশ্বাসের অভাবটাই দেখা দেয় বড় হয়ে। আর বিশ্বাস আছে কি নেই এই দোটানায় পড়ে অনেকেই ঘাবড়ে যায় বা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে। সেইসঙ্গে আত্মবিশ্বাসের অভাবের উল্টো পিঠে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও বিপাকে ফেলে দেয় অনেকে। আত্মবিশ্বাসের এই গোলমেলে অবস্থা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হলে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে কিছু কৌশলী অবস্থার মধ্য দিয়ে। 

বিকল্প সিদ্ধান্তটাই ভালো ছিল

অনেক সময়ই হয়তো আপনার মনে হয় যে, আজ যে সিদ্ধান্তটার কারণে আপনার নানা হাঙ্গামা পোহাতে হচ্ছে, এর উল্টোটা করলেই হয়তো ভালো হতো। আসলে শুধু আপনার জন্যই যে এ ভাবনাটা সত্য, তা কিন্তু নয়। বরং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতটাই এমন যে, সে যখন কোনো সিদ্ধান্তের কারণে বিপদে পড়ে, তখন আগে ছেড়ে আসা বিষয়গুলোকেই বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। এসব ক্ষেত্রে ধৈর্যহারা না হয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে করণীয়টা দ্রুত ঠিক করে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা, হতবিহ্বল হয়ে আপনি যে সময়টায় আপনার সিদ্ধান্ত নিয়ে আফসোস করবেন, সে সময়টাতেই হয়তো আপনি আরেকটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ হারাবেন। আবার মাঝে মাঝে এমনও হতে পারে যে, আজ যে সিদ্ধান্তটিকে আপনি ভুল ভাবছেন, আত্মবিশ্বাস আর দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার মাধ্যমে সেটিকেও সময়ের ব্যবধানে খুব সঠিক বলে প্রমাণ করা সম্ভব। কাজেই কী করলে কী হতো না ভেবে, কী হলে কী করা উচিত—সেটি ভাবতে পারাটাই হলো আত্মবিশ্বাসী হওয়ার লক্ষণ।

যদি ভুল হয়

তাড়াহুড়ো করেই হোক, কিংবা ভেবেচিন্তেই হোক যে সিদ্ধান্তটি আপনি নিয়েছেন তাতে ভুল হতেই পারে। আবার সময়ের ব্যবধানে তা সঠিক বলেও প্রমাণিত হতে পারে। তবে কী হবে তা না জেনে আগে থেকেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলাটা আপনার জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাছাড়া আত্মবিশ্বাসের অভাবজনিত এই হতাশা আপনাকে আরও কিছু ভুল সিদ্ধান্তের দিকেও ঠেলে দিতে পারে। তাছাড়া আপনিও নিশ্চয়ই এ বিষয়টায় একমত হবেন যে, একটা ভুলের কথা ভেবে দশটা ভুল করাটা আস্ত বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়।

মনে হচ্ছে ঠিক, তবুুও!

এই দলে যারা পড়েন, তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ন্যূনতম উপস্থিতি খুঁজে পাওয়াটাও মুশকিল। কেননা, যারা একটা ঠিক কাজ করেও তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তাদের মাঝে আর যাই হোক আত্মবিশ্বাস যে নেই, সে কথা চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়। এই দলের জন্য আমাদের প্রথম পরামর্শ হলো নিজের প্রতি মনোযোগী হোন এবং আপনার আগের অর্জন বা সফলতাগুলোর দিকে ফিরে দেখুন। এর আগে যদি আপনার একটি সিদ্ধান্তও সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে এটি হবে না কেন? এ জাতীয় একটি বিশ্বাস নিজের মধ্যে ধারণ করুন এবং যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন যে, আপনার সংশয় আদৌ যৌক্তিক কি-না। ‘আমাকে দিয়ে হবে না’—এটি ভাবার পরিবর্তে মনকে বোঝান যে, ‘যা হওয়ার তা আমাকেই করতে হবে এবং এটি অবশ্যই সম্ভব।’

আপনার বয়সী একটি বন্ধু যে কাজটি পারে, সেটি আপনি না পারার কি কোনো যুক্তি থাকতে পারে। আবার, অন্য কেউ না পারলেও যে আপনি একটা নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারবেন না, তাও কিন্তু নয়। কাজেই অন্যকে দেখে শুধু আত্মবিশ্বাসের সন্ধানই নয়, বরং নিজের মাঝে নতুন কিছু করার একটা জেদও তৈরি করতে পারেন। তবে, এই নতুনটা যেন মন্দ কিছু না হয় সে বিষয়ে অবশ্যই সাবধান হতে হবে।

মডেল মিম