নানাবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রশিক্ষণক্ষেত্রে বেশ কিছু অগ্রগতি ক্রমান্বয়ে ঘটেছে, যা আলোচনা করা প্রয়োজন। স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত ও অপর্যাপ্ত। সম্পদ, সময়, সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের অভাব ছিল এর অন্যতম কারণ। কিন্তু বর্তমানে প্রশিক্ষণক্ষেত্রে অগ্রগতি লক্ষণীয় পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোর ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট আগ্রহী এবং ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে তার প্রতিফলন ঘটেছে। বর্তমানে শতাধিক সরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল সিস্টেম চালু করা হয়েছে। যেমন : ইন্টারনেটের ব্যবহার, ইমেইলে যাবতীয় তথ্য প্রদান, রিভর সিস্টেম চালু করা, ক্লাসরুম কনটেন্টে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার ইত্যাদি।
প্রশিক্ষণ ক্লাসরুমের পরিবেশ এখন আগের থেকে অনেক আধুনিক, সেশন পরিচালনার পদ্ধতিতে রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া, মালটিমিডিয়া প্রজেক্টর রয়েছে অধিকাংশ ক্লাসরুমেই। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রয়েছে বিদেশ ট্যুর। তাছাড়া দেশে, বিদেশে স্কলারশিপের মাধ্যমে উচ্চতর কোর্স করার সুযোগও রয়েছে অনেক। ব্রিটিশ কাউন্সিল বা তদ্রূপ স্বনামখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে বা আউটসোর্সিং করে প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগও করে দেয় প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলো। উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশে সদা তত্পর প্রশিক্ষণ কর্ণধারগণ। এখন শুধু তাত্ত্বিক দিকই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সেই সঙ্গে ব্যাবহারিক দিকটিকেও প্রধান্য দেওয়া হয় সমানভাবে। আগে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ তেমন একটা পেতেন না কিন্তু বর্তমানে এ সুযোগ অনেকটা অবারিত। কনিষ্ঠ কর্মকর্তারাও দ্রুত বিদেশ প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন, কখনো-বা স্কলারশিপ পছন্দ করারও সুযোগ পাচ্ছেন।
ইতিমধ্যে জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ নীতিমালা (PATP-2003) জারি করা হয়েছে এবং জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। প্রশিক্ষণকে গতিশীল, গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে চাকরিতে প্রবেশের পর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। কিছু কিছু প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সব প্রশিক্ষণার্থীকে কিংবা প্রশিক্ষণের ফলাফলের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট হারে প্রশিক্ষণার্থীদের বিদেশে শিক্ষা সফরে/এক্সপোজার ভিজিটে প্রেরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের দৈনিক ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ৩০ শতাংশ হারে বিশেষ ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা চালু আছে, যদিও ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন আদেশের একটি বিশেষ বিধানের কারণে সে সুবিধা কার্যত ১০-১২ শতাংশে প্রদত্ত হচ্ছে।
প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নে সরকার, বেসরকারি কর্তৃপক্ষ সকলেরই এগিয়ে আসা উচিত। আর এটি তখনই সহজতর হবে যখন সকলেই এর গুরুত্ব অনুধাবন করবে। আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণে উদ্ভাবন পরস্পরের সম্পূরক। আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির জন্য দরকার আর্থিক সচ্ছলতা, প্রয়োজনমাফিক জনবল এবং অবকাঠামোগত আনুকূল্য। শুধু সময়োপযোগী করা নয়, প্রশিক্ষণকে, আকর্ষণীয় ও হূদয়গ্রাহী করার জন্যও আধুনিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।
আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে প্রাক-প্রশিক্ষণ চাহিদা নিরূপণ, প্রাক-প্রশিক্ষণার্থী মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণোত্তর প্রশিক্ষণার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতির মিশ্রিত ব্যবস্থাপনা, ই-ট্রেনিং বা অনলাইন ট্রেনিং, দূরপ্রশিক্ষণ, ইনডোর-আউটডোর বা ব্যাবহারিক-তত্ত্বীয় মিশ্রণে প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার, কুইজ-ধাঁধা প্রতিযোগিতা, দল-উপদলভিত্তিক প্রতিযোগিতা আয়োজন, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আকর্ষণীয় করা, পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণার্থী মূল্যায়ন, যথাযথ বিনোদন ও অবসর সহযোগে প্রশিক্ষণসহ নানাবিধ ব্যবস্থার উল্লেখ করা যেতে পারে। পুরস্কার, স্বীকৃতি, উপযুক্ত পদায়ন, উচ্চতর শিক্ষা-প্রশিক্ষণের সুযোগ, বিদেশ সফরসহ নানাবিধ প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণকে আরো আকর্ষণীয় করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের প্রশিক্ষণের মান সব প্রতিষ্ঠানে এক মানের নয়। অনেক প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের মান নিয়ে অনেক প্রশ্নও রয়েছে। এর জন্য ঢালাওভাবে ঐসব প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা ঠিক হবে না। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও জনবলের অনেক সংকট রয়েছে, নেই স্বায়ত্তশাসন এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন করতে না পারলে বাংলাদেশের পক্ষে এসডিজি ২০৩০, ভিশন ২০৪১, অর্জনের জন্য যে জনসম্পদ প্রয়োজন তা তৈরি করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশের প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নে যেসব বিষয়ে লক্ষ্য দেওয়া উচিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হলো। (১) প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রয়োজনীয় স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা। প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য ভিন্ন গভর্নিং বডি তৈরি করা এবং তার মাধ্যমে পরিচালিত করা। (২) প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সম্পদ ও বাজেট নিশ্চিত করা। (৩) প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে আগ্রহী ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বা প্রশিক্ষকদের নিয়োগ বা পদায়ন করা। যেসব কর্মকর্তা বিশেষ বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছেন তাদেরকে প্রণোদনাসহ পদায়ন করা। প্রশিক্ষকদের পূর্ণহারে (৩০%) প্রশিক্ষণ ভাতা প্রদান করা। (৪) প্রশিক্ষণ প্রদানের সময় লেকচার ও আলোচনা পদ্ধতির পাশাপাশি অন্যান্য পদ্ধতির (যেমন—সিমুলেশন, রোল প্লে, কেস স্টাডি, অভিজ্ঞতা বিনিময়, দলীয় কাজ, প্যানেল ডিসকাশন, ভিডিও ম্যাটেরিয়াল ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ইত্যাদি) পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি করা। (৫) তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে e-Learning, দূরপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। (৬) প্রশিক্ষণার্থীদের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় এবং বাস্তবতাভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদানের জন্য মাঠ-সংযুক্তি কার্যক্রম বাড়ানো। (৭) প্রশিক্ষণার্থীদের বেশি বেশি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করানো, যাতে তারা সংস্কৃতিমনা হয়ে গড়ে ওঠে। (৮) খেলাধুলাসহ অন্যান্য সহপাঠ কার্যক্রমে প্রশিক্ষণার্থীদের নেতৃত্ব প্রদানে উত্সাহ প্রদান করা। (৯) প্রশিক্ষণ প্রদানের আগে-পরে প্রশিক্ষণের চাহিদা নিরূপণ ও কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের প্রভাব যাচাই করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। (১০) ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও উত্সাহ প্রদান করা এবং নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ করা বা ভুল কাজের জন্য তত্ক্ষণাত্ তিরস্কার বা প্রয়োজনীয় শাস্তি প্রদান করা। (১১) প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং প্রশিক্ষণার্থী মূল্যায়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা, মেধা তালিকায় শীর্ষস্থান অর্জনকারীদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানো। (১২) মনোনিবেশ (Concentrate) বৃদ্ধি ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালনের সুবিধার্থে সব প্রশিক্ষণ কোর্স আবাসিক করা এবং আবাসিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা। (১৩) সব প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে রিসোর্স পারসন নির্বাচনের নীতিমালা সংরক্ষণ করা এবং সে অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া। কোর্স ব্যবস্থাপনা টিম যাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো রিসোর্স পারসনকে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য না হয় বা প্ররোচিত না হয় বা প্রলোভিত না হয়, সে ধরনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। (১৪) বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তার প্রশিক্ষণ প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিতে পারলে একদিকে যেমন প্রশিক্ষণ কাজে আসবে, অন্যদিকে কর্মকর্তারা হবেন প্রশিক্ষণে আগ্রহী। (১৫) প্রশিক্ষকদের সামাজিক মানমর্যাদা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং (১৬) সর্বোপরি জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ নীতিমালা যথাযথ অনুসরণ করা এবং জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন করা।
বাংলাদেশ প্রশিক্ষণ সেক্টর সব সময়ই কম গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে প্রশিক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানের। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানসমূহকে উন্নত করতে হবে আন্তর্জাতিক মানে। প্রয়োজন Public Training Policy ২০০৩-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন। প্রণয়ন করতে হবে ‘জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতিমালা’। প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন সব প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের। গড়ে তুলতে হবে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক, প্রয়োজন সময়োপযোগী সংস্কার ও প্রশিক্ষণ কারিকুলামে সমন্বয় সাধন করতে হবে সব প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেন একই প্রশিক্ষণের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যেন যথাযথভাবে বস্তবায়ন করতে পারে নিজ নিজ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।
উন্নত বাংলাদেশ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের সংস্কার প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের কর্মিবাহিনী ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব প্রদান সম্ভব নয়। আর আন্তর্জাতিক মানের কর্মী তৈরিতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান। বিশ্বমানের সরকারি কর্মিবাহিনী তৈরির উপযোগী প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও মনোযোগ। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানসমূহকে উন্নয়নের মাধ্যমে এ গুলোকে গড়ে তুলতে হবে ‘Hub of excellence’ হিসেবে।
n লেখক : কলাম লেখক ও সাবেক সচিব