মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা!

প্রাণঘাতী করোনার ছোবলে বিপর্যস্ত গোটা দেশ। স্থির হয়ে আছে জনজীবন। এরই মাঝে নতুন করে হানা দিয়েছে এডিস ইজিপ্টি স্ত্রী মশাবাহিত ভয়াবহ রোগ ডেঙ্গু জ্বর। সময় মতো কার্যকর চিকিত্সা না পেয়ে দ্রুতই মারা যাচ্ছে মানুষ, হাসপাতালের বেড হচ্ছে অসুস্থ রোগীদের বর্তমান আবাসস্থল। করোনা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার যখন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই নতুন করে ডেঙ্গুর উত্পাত জনমনে সৃষ্টি করেছে ভীতি। উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় দিন পার করতে হচ্ছে সবাইকে!

ডেঙ্গু ভাইরাস মূলত ফ্ল্যাভিভাইরিডি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এক সূত্রক আরএনএ ভাইরাস। এডিস ইজিপ্টি স্ত্রী মশা এই ভাইরাসটির একমাত্র প্রধান বাহক। জীবাণুবাহী এই মশা কামড়ানোর ৩-১৪ দিনের মধ্যেই ব্যক্তির শরীরে অস্বাভাবিক জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ পরিলক্ষিত হয়। ডেঙ্গু জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এই জ্বরের অন্যতম লক্ষণ। তাই একে ‘ব্রেক বোন ফিভার’ও বলা হয়। জ্বর হওয়ার চার-সাত দিনের ভেতর রোগীর বুকে-পিঠে লালচে র্যাশ, শরীরের বিভিন্ন হাড়, কোমর, অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথার পাশাপাশি রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তে অণুচক্রিকার মাত্রা অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পাওয়া, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, অকস্মাত্ জ্ঞান হারিয়ে ফেলা, বমি বমি ভাব, জন্ডিস এমনকি কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে দেখা দিতে পারে রেনাল ফেইলিউরের মতো গুরুতর সমস্যা।

ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী ৭-২১ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে গেলেও সময় ও পরিস্থিতি ভেদে সুচিকিত্সার অভাবে অনেক রোগীর অকাল মৃত্যু ঘটে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য মতে, চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে ২৮ জন। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতির ভয়াল ঘূর্ণাবর্তে দেশের হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে রোগী ধারণ ক্ষমতা চরম সংকটে। তাই বর্ধিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ব্যবস্থাও নেই সেখানে। ডেঙ্গু টেস্ট কিটেরও রয়েছে ব্যাপক স্বল্পতা। করোনা ও ডেঙ্গুর উপসর্গ প্রায় কাছাকাছি হওয়ায় টেস্ট ছাড়া চিকিত্সা গ্রহণে সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতার। তাছাড়া আইসিইউগুলোতে কোভিড-১৯ রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা পড়ছে সংকটের মুখে; উদ্ভব ঘটছে নেতিবাচক পরিস্থিতির! এমতাবস্থায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এভাবে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে হাসপাতালগুলোয় রোগীর জায়গা ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খেতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

তাই উদ্ভুত এ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টায় এডিস মশার উত্স ধ্বংস করাই হবে সংক্রমণ ঠেকানোর একমাত্র উপায়। এ ক্ষেত্রে, আত্মকেন্দ্রিক সচেতনতার পরিবর্তে পরিবার, সমাজের অসচেতন জনগোষ্ঠীর ভেতরকার সচেতনতাকে জাগ্রত করার মাধ্যমে এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ মিলবে। সে কারণেই সবাইকে সঙ্গী করে এগুতে হবে সমানতালে। আবাস্থল ও বাড়ির চারপাশের পরিবেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার এ দায়িত্বকে নিতে হবে চ্যালেঞ্জ হিসেবে। জৈব-অজৈব বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং বসতবাড়ির ময়লা আবর্জনা ফেলতে হবে নিয়ম মেনে সুনির্দিষ্ট স্থানে। সংক্ষিপ্ত মানবজীবনে সুদীর্ঘ মৃত্যুর মিছিলকে প্রতিহত করতে সবাইকে কাজ করতে হবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। সর্বোপরি, অদূর ভবিষ্যতেও এ জাতীয় অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত দুর্যোগ এড়াতে নিজেদের ভেতরকার এ সচেতনতা ও সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টাকে নিত্যদিনের সুস্থ অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়