দিনের শেষে মাস, মাস শেষে বছর চলে যায়। কিন্তু ফেরেন না গুম হওয়া ব্যক্তিরা। তাদের ফেরার আশায় পথ চেয়ে বসে থাকেন স্বজনরা। যেমন সন্তানের পথ চেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন কোনো মা-বাবা, ভাইয়ের আশায় বোন, স্বামীর আশায় স্ত্রী বা পিতার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকেন সন্তানরা। কিন্তু বছরের পর বছর চলে যায়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের চোখের জল শুকায় না। তাদের দাবি গুম হওয়া ব্যক্তিদের যেন রাষ্ট্র ফিরিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়। স্বজনদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই দাবিতে সোচ্চার হন তারা।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী রাজনীতিবিদরা বলেন, প্রতি বছর গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা এই দিনে এখানে এসে মিলিত হন। কিন্তু তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। কি আশ্বাস বাণী দেব তাদের। কোনো সান্ত্বনাই তো তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা চাই গুম হওয়া ব্যক্তিদের যেন উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে কার্যকর ব্যবস্থা রাষ্ট্র ও সরকার গ্রহণ করে। প্রেসক্লাবের ভেতরে ও বাইরে পৃথক দুটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেইসব অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছাড়াও গুম হওয়া আনোয়ার হোসেনের মেয়ে রাইসা, মো. সোহেলের মেয়ে সাবা, মো. কাউসারের মেয়ে মীম, সেলিম রেজার বোন রেহানা আখতার মুন্নী, সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আখি ও খালেদ হোসেনের মেয়ে শাম্মী আখতার নিপা বক্তব্য রাখেন।
প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের অসহায়ত্বের দায় সরকারকেই নিতে হবে। এখানে অনেকে আছেন যে, ৯ বছর ১০ বছর ধরে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের সাবেক এমপি সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী, ঢাকার কমিশনার চৌধুরী আলমসহ আজকে আমাদের ৫০০-এর অধিক নেতাকর্মী গুম হয়ে গেছেন ৭/৮/৯ বছর ধরে। তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীর মেয়ে এখন বড় হয়েছে, সে এখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে যে, কখন তার বাবা ফিরে আসবে? বাবা ফিরে আসে না।
মির্জা ফখরুল সরকারের উদ্দেশে বলেন, আপনারা বলেন যে, এখানে এগুলো (গুম) হয় না। তা হলে গেল কোথায়? দায়িত্ব তো আপনাদের। খুঁজে বের করে তাদেরকে তাদের পরিবারের কাছে একে একে ফেরত দিন। অন্যথায় ইতিহাসের কাঠগড়ায় আপনাদেরকে তার জবাব দিতে হবে।
বিএনপির মানবাধিকার সেলের উদ্যোগে ‘গুম প্রতিরোধে’ আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষ্যে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে গুম হওয়া ব্যক্তির স্বজনরাও অংশ নেন।
এদিকে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত সভায় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সরকারের উদ্দেশে বলেন, যেই সরকার এখন ক্ষমতায়, তারা হূদয়হীন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটি ৩৪ জনের তালিকা দিয়ে বলেছে—এই মানুষগুলোর খোঁজ চাই।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, মানুষ গুম হচ্ছে, খুন হচ্ছে। আমার ধারণা সরকার এসব বিষয় অবশ্যই জানেন। তিনি বলেন, আমরা গুম-খুনের জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করিনি। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, গুম একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।
গুমের শিকার হওয়া তাদের প্রিয় মানুষটির ছবি বুকে নিয়ে অনুষ্ঠানে স্বজনরা অংশ নেন। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে সরকার ও প্রশাসনের কাছে গুম হওয়াদের ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তারা।