বৈদ্যুতিক ফাঁদে হাতি হত্যা: ১২ জনের বিরুদ্ধে দুই মামলা

কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালংয়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদে ফেলে বন্য মা হাতি হত্যার পর মাথা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খণ্ড খণ্ড করার ঘটনায় মামলা হয়েছে। জমির মালিকসহ ১২ জনকে আসামি করে আদালত ও থানায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে পৃথক দুটি মামলা করেছেন কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ধোয়াপালং রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন। 

এ মামলায় বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা জমির মালিক নজির আহমদকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন রেঞ্জ কর্মকর্তা সাজ্জাদ। 

মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) সন্ধ্যায় মামলা দুটি করা হয়। এর আগে একইদিন ভোররাতের কোন এক সময় বৈদ্যুতিক ফাঁদে ফেলে হাতিটি হত্যার পর সবার চোখ ফাঁকি দিতে হাতির মাথা, পাসহ শরীরের নানা অঙ্গ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুরে সেসব খণ্ডিত প্রত্যঙ্গ উদ্ধার করে বন বিভাগ। 

ধোয়াপালং রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকার পাদদেশ ও আশপাশে জোত (খতিয়ানভূক্ত) জমি রয়েছে। এখানে চাষ করা ফসলে হাতির পাল হানা দেয়। ফসলে হাতির হানা রোধে অনেকে আইন বহির্ভূতভাবে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতে। গত বছরের শেষ দিকেও এভাবে একটি হাতি মারা যাওয়ার পর বৈদ্যুতিক ফাঁদ না পেতে চাষাবাদ করতে গত জানুয়ারিতে সচেতনমূলক সভা করা হয়। সভার পর করা হয় মাইকিংও। সেসময় বলা হয়, হাতির পাল ফসল নষ্ট করলে আবেদনের ভিত্তিতে বনবিভাগ যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিবে। বন্যপ্রাণীর চলাচল ঠেকাতে এভাবে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা বেআইনি। এর কঠিন শাস্তি রয়েছে। এরপরও বন্যপ্রাণী হত্যা গোপন তৎপরতা করছে দুর্বৃত্তরা।’

ছবি: ইত্তেফাক

রেঞ্জ কর্মকর্তা সাজ্জাদ আরও বলেন, ‘হাতিটিকে বিদ্যুতে হত্যার পর নৃশংসভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছে। এ ঘটনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। আমি বাদি হয়ে একটি মামলা আদালতে এবং অপর মামলাটি থানায় রুজু করেছি। ধৃত নজির আহমদ হাতি হত্যার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। তার স্বীকারোক্তি মতে, ঘটনায় জড়িত ১২ জনকে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মৃত হাতির আলামত সংগ্রহ করেছেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।’

ছবি: ইত্তেফাক

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণয় চাকমা বলেন, ‘কক্সবাজারের অধিকাংশ এলাকা পাহাড় বেষ্টিত। এখানে বন্য প্রাণীদের সাথে একীভূত হয়ে বসবাস ও চাষাবাদ করতে হয়। কিন্তু ফসলের ক্ষতি রোধে বন্যপ্রাণীদের হত্যার অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে। মঙ্গলবারের ঘটনা চরম নৃশংস। এটার যথোপযুক্ত শাস্তি হলে অন্যরা এমন কাজ করতে ভয় পাবে আশা করছি।’

খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল মাবুদ বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা হাতিটি হত্যার পর শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে মাটি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সকাল হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা বিষয়টি টের পেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবহিত করা হলে তারা ঘটনাস্থল এসে হাতিটির খণ্ডিত পা, শূর ও টুকরো উদ্ধার করেছে বনবিভাগ। নিরীহ একটি প্রাণীকে এভাবে নৃশংস হত্যা কোনমতে মানা যায় না। হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে জমির মালিক নজির আহমেদকে আটক করে।’

কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ধৃত নজির আহমদসহ অন্য অভিযুক্তরা বনবিভাগের সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী। অন্যদের মতামতের ভিত্তিতে তাদের সেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি পাহাড়ের এসব এলাকায় দেওয়া বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করতে ব্যবস্থা নিতে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে আবেদন জানানো হয়েছে। এসব বিষয় উল্লেখ করে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে লিখিত জানানো হচ্ছে। আমরা চাই হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব অচিরেই নিরসন হউক।’

ইত্তেফাক/এএএম