১৬৪২ সালের শেষের দিকে অ্যাবেল তাসমান নামে একজন অভিজ্ঞ ডাচ নাবিক সমুদ্রপথে যাতায়াতের সুবাদে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে সুবিশাল এক মহাদেশের সন্ধান পান। তিনি ধারণা করতেন, নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ হাম্পশ্যায়ারের কাছেই সুবিশাল এই মহাদেশটি লুকিয়ে আছে। যদিও পৃথিবীর এই তাবত্ অংশটির কথা তখনো সাধারণ মানুষের কাছে অজানা। ইতিহাসে পটু এই নাবিক প্রাচীন রোমের ইতিহাস ঘেঁটে টেরা ওস্ট্রালিস নামের এই জায়গা সম্পর্কে আরো বিস্তৃত ধারণা পান। অতঃপর তিনি তাঁর ছোট্ট দুটি জাহাজ ও কিছুসংখ্যক সুদক্ষ নাবিক নিয়ে জাকার্তা থেকে সে স্থানটি জয় করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পশ্চিমের উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণ অভিমুখী হয়ে শেষে পূর্ব উপকূলে গিয়ে নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডে সফলভাবে নোঙর করেন তিনি। সাউথ আইল্যান্ডে পৌঁছানোর পরের দিন সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা ছোট ছোট নৌকায় করে জাহাজ দুটিকে আক্রমণ করে বসে। তাদের দুর্বোধ্য ভাষা বুঝতে পারেননি জাহাজের নাবিকরা। ফলে অতর্কিত হামলা ও সংঘর্ষ এড়াতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান চার নাবিক। জাহাজে থাকা নৌকায় আগুন ধরিয়ে দেয় স্থানীয়রা। অ্যাবেলের অভিযানের এখানেই সমাপ্তি ঘটে। মৃত্যুর আগে তিনি এই স্থানকে ‘মার্ডারারস বে’ হিসেবে অবিহিত করেছিলেন। এই ঘটনার বহু বছর পর, নিউজিল্যান্ডের ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানী ও গবেষকগণ ১৯৬০ সালের গোড়ার দিকে তেলের খনি অনুসন্ধানকালে ‘জিল্যান্ডিয়া’র মহাদেশীয় অস্তিত্বকে প্রথমবারের মতো সবার সামনে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
মহাসমুদ্রের অতলে লুকিয়ে থাকা এ মহাদেশটিকে আকস্মিকভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি, বরং ধীরে ধীরে এর অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, প্রায় ২০ কোটি বছর আগে গন্ডোয়ানাল্যান্ড থেকে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, অ্যান্টার্কটিকা ও ভারত মহাদেশ বিভক্ত হওয়ার সময় সাগরতলে হারিয়ে গিয়েছিল এ মহাদেশ। জিল্যান্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা থেকে প্রায় সাড়ে ৮ থেকে ১৩ কোটি বছর আগে বিচ্ছিন্ন হয়। ৬ থেকে ৮.৫ কোটি বছর আগে জিল্যান্ডিয়া বিচ্ছিন্ন হয় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ থেকেও। এরপর ক্রমশ এটি পানির নিচে নিমজ্জিত হতে থাকে। ২.৩ কোটি বছর আগে সম্পূর্ণ মহাদেশটিই নিমজ্জিত ছিল। নিউজিল্যান্ডের ঔপনিবেশিক হার্স্টহাউজ ১৮৫৭ সালে তাঁর বই ‘New Zealand or Zealandia, the Britain of the South’-এ লিখেছিলেন, ‘নিউজিল্যান্ডের ভূপ্রকৃতি এই তত্ত্বকে নির্দেশ করে যে এটি মূলত সুবিশাল কোনো মহাদেশের একটি ক্ষুদ্র অংশ, যেটি দীর্ঘসময় আগে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে।’ সম্প্রতি, বহুবছর ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের লবণাক্ত পানির নিচে ডুবন্ত এই মহাদেশের বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডে আগ্নেয়, রূপান্তরিত ও পাললিক শিলার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
জিল্যান্ডিয়া মহাদেশের বর্তমান আয়তন প্রায় ৪.৯ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। আকারে এটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সমান এবং ইউরোপ মহাদেশের অর্ধেক। বর্তমানে মহাদেশটির ৯৪ শতাংশই পানির নিচে। ওপরের অংশ মাত্র ৬ শতাংশ। জিল্যান্ডিয়ার মহাদেশীয় ভূখণ্ডের শুধু নিউজিল্যান্ডের নর্থ ও সাউথ আইল্যান্ড এবং নিউ ক্যালেডোনিয়া অঞ্চলই পানির ওপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিউজিল্যান্ড রাষ্ট্র এই মহাদেশের একমাত্র দৃশ্যমান পর্বত চূড়া। খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যপূর্ণ ‘জিল্যান্ডিয়া’ নিউজিল্যান্ড মহাদেশ বা তাসমান্টিস নামেও সমধিক পরিচিত। ২০০২ সালে প্রণীত ব্যাথিমেট্রিক মানচিত্র থেকে জানা যায়, জিল্যান্ডিয়া একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এক সমন্বিত ভূখণ্ড। মহাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে ভূখণ্ডের বিভিন্ন ধরনের শিলার উপস্থিতি, গভীরতা, টিলাসহ যেসব বৈশিষ্ট্য দরকার তার সবকটিই পূরণ করেছে এই মহাদেশ। তাই বর্তমান সাতটি মহাদেশের বাইরে জিল্যান্ডিয়াকে অষ্টম মহাদেশ হিসেবে ঘোষণার জোরালো দাবি জানাচ্ছেন সেখানকার সংশ্লিষ্ট গবেষক ও পরিবেশ বিজ্ঞানীগণ। এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির সুদীর্ঘ অপেক্ষার পরিসমাপ্তি হলে জিল্যান্ডিয়া হবে পৃথিবীর অষ্টম ও সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম এবং রহস্য-রোমাঞ্চে ভরপুর এক অত্যাশ্চর্য মহাদেশ!
মো. মিজানুর রহমান