যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বহির্বিশ্বে সবচাইতে দীর্ঘ সময় যুদ্ধের ময়দানে থাকিয়া ৩১ আগস্ট আফগানিস্তান ত্যাগ করিল মার্কিন সৈন্যরা। সবচাইতে দীর্ঘমেয়াদি বলিতে হইবে এই কারণে যে, যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হইতে জার্মানি, ইতালি, জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য রহিয়াছে, কিন্তু তাহা প্রতীকী এবং আনুষ্ঠানিক। ঐ সকল দেশে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর শত্রুভূমি হিসাবে অবস্থান করে না, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই সময়কার সেই দেশগুলি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে কাছের মিত্র। এখন প্রশ্ন হইল, আফগানিস্তান হইতে এই সৈন্য প্রত্যাহারের পর কেমন হইতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক? তালেবানদের সঙ্গে কী বোঝাপড়া হইয়াছে তাহা আমাদের জানা নাই, কিন্তু ইহা আমরা বুঝিতে পারি, একটি সুরাহা হইয়াছে, যাহাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করা হইয়াছে যে, সকল কিছু স্বাভাবিকভাবেই চলিবে, বাড়াবাড়ি করা হইবে না। সকল কিছু সেই মতোই চলিয়াছে। তালেবান ও মার্কিন সেনারা প্রায় পাশাপাশি অবস্থান করিয়া কাবুল বিমানবন্দর দিয়া মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকসহ ১ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষকে আফগানিস্তান হইতে বাহির করিয়া লইয়াছে। এত অধিক মানুষকে অল্প সময়ে বাহির করিয়া লওয়া কোনো সহজ বিষয় নহে। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র সময় খানিকটা বাড়াইবার কথা বলিয়াছিল। কিন্তু তালেবানরা রাজি না হওয়ায় ডেটলাইন ৩১ আগস্টই রাখা হইয়াছে। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশংসাই করিতে হয় যে, যাহারা যুক্তরাষ্ট্র বাহিনীকে নানাভাবে সহায়তা করিয়াছেন, দোভাষীর কাজ করিয়াছেন, তাহাদেরকে পিছনে ফালাইয়া যায় নাই। ইতিপূর্বে আমরা দেখিয়াছি, উন্নয়নশীল বিশ্বে অনেক দেশ পরাজিত হইয়া যাহারা সহায়তা করিয়াছে তাহাদের ফেলিয়া চলিয়া গিয়াছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি সকল কিছু স্বাভাবিক না থাকে? সেই ক্ষেত্রেও বুঝিয়া লইতে হইবে যে যুক্তরাষ্ট্র তাহার সক্ষমতাকে মাটিচাপা দিয়া যায় নাই। তাহার প্রমাণ, যেই আইএস-কে কাবুল বিমানবন্দরে হামলা চালাইয়াছিল যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিকতম ড্রোন আসিয়া মুহূর্তের মধ্যেই সেই পরিকল্পনাকারীদের উপর সফল হামলা চালাইয়াছে। আমরা সকলেই জানি, বুঝি কিংবা অনুমান করিতে পারি যে, তাহাদের হাতে যেই আধুনিকতম অস্ত্র বা টেকনোলজি থাকে, উহার দুই বা তিন স্তরের পিছনের টেকনোলজি অন্যদের কাছে দিয়া থাকে। প্রসঙ্গত, সৈন্য প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত বর্তমান বাইডেন প্রশাসনের নহে, বিগত ট্রাম্প সরকার নিয়াছিল। এখন তাহারাই সৈন্য প্রত্যাহার লইয়া নানারকম সমালোচনায় লিপ্ত হইয়াছেন। কিন্তু ধৈর্যহারা না হইয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরে-বাহিরে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনাকারীদের অপেক্ষা করিতে হইবে সামনের দিনগুলির জন্য। দেখিতে হইবে ঘটনাবলি কোনদিকে গড়ায়। এই অঞ্চলে সকল কিছু শান্ত হইয়া যায় নাই। উদ্বেগ রহিয়াছে কাশ্মীর পরিস্থিতি লইয়া, উদ্বেগ রহিয়াছে ইরান প্রশ্নে, ইয়েমেন প্রশ্নে। ইরানের পরমাণু ইস্যু লইয়া নিকট ভবিষ্যতে কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাহা বলা যায় না। ইহা ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ছিলেন বারাক ওবামা প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। সুতরাং আফগানিস্তান লইয়া তাহার নিজের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রহিয়াছে।
সর্বোপরি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে এখনই শান্ত হইয়াছে বলা যাইবে না। সেইখানে অ্যাকটিভ রহিয়াছে তালেবানবিরোধী নর্দান অ্যালায়েন্স-খ্যাত দুর্ধর্ষ একটি দল এবং আইএস-কে (ইসলামিক স্টেট খোরাসান)। নর্দান অ্যালায়েন্স অবস্থা করিতেছে আফগানিস্তানের পান্জশির প্রদেশে। যদিও প্রায় সংঘর্ষের মুখোমুখি হইয়া সাময়িকভাবে দুই পক্ষই একে অপরকে আক্রমণ করিবে না বলিয়া সম্মত হইয়াছে, কিন্তু মনে রাখিতে হইবে এই দুই দল একে অপরকে চিরশত্রু বলিয়া মনে করে। অধিকন্তু আফগানিস্তান জাতিগত বৈচিত্র্যের দেশ। সেইখানে পশতুন, কাজিক, তাজিক, বালুচসহ বেশ কয়েকটি জাতি রহিয়াছে—যাহাদের চিন্তা ও সংস্কৃতিতে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। অন্যদিকে তালেবানরা পরিপূর্ণ সরকার গঠনে হিমশিম খাইতেছে, যাহা একটি বিশৃঙ্খল অবস্থাও তৈরি করিতে পারে। সুতরাং শেষ মন্তব্য করিবার সময় এখনই নহে।