তখন বুলবুল চৌধুরী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তাঁকে দেখতে যাওয়া হয়। এমনিতেই চিকন-চাকন গড়নের মানুষ তিনি। ক্যানসারের ধকলে খাবার-দাবার কমে গেছে, ফলে শরীর শুকিয়ে বিছানায় মিশে গেছে। ক্যানসার ধরা পড়ার কিছুদিন পর তিনি কেমো নিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে ডাক্তাররা যা বলেন সেরকমই বলে দিয়েছেন। বুলবুল ভাইয়ের মুখে রুচি নেই। খেতেও পারেন না তেমন। মাথা থেকে ঘাড় হয়ে ঝুলে পড়া তাঁর সোনালি চুল ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। অবশ্য আগেই ডাক্তাররা সেরকম ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল, কেমো নেওয়ার ফলে তাঁর মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে। চুল পড়ে গেলে তাকে কেমন দেখাবে—এই বিষয়টা বুলবুল ভাইকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল।
চুল বিহীন মাথায় কেমন যেন অপরিচিত লাগে তাঁকে। মাথার চুল পড়ে গেছে—এ নিয়েও তাঁর অনেক আক্ষেপ।
প্রথম কেমো নিয়েছেন তখন বুলবুল চৌধুরী। একদিন আমি আর ধ্রুব এষ তাঁকে দেখতে গিয়েছি। ভাবি রান্নাবান্না করছেন। দুপুরের দিকে আমাদের নিয়ে ছাদে গেলেন তিনি। ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দুপুরের রোদ পোহানো তাঁর প্রিয় অভ্যাস। আমি কিছুটা দূরে বসে বসে রেলিংয়ের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে থাকা বুলবুল ভাইকে দেখছি। আমার ধারণায় বুলবুল ভাইয়ের মতো এরকম পায়ের পাতায় ভর করে নিপাট ভঙ্গিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর কেউ বসে থাকতে পারবে না। এটা কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব।
তাঁর দীর্ঘকালের অভ্যাস মাথার চুলে হাত দিয়ে তাঁর সোনালু লতার মতো ঝুলে থাকা লম্বা চুলগুলোকে পেছনের দিকে নামিয়ে দেওয়া। আজও সেরকম করছিলেন, কিন্তু চুল তো নেই মাথায়। তারপরও তিনি অভ্যাসবশত চুল পেছনের দিকে সরিয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করছেন আর বাচ্চা ছেলেদের মতো ধ্রুবকে বলছেন, ‘ধ্রুব, আমার চুল কি আবার আগের মতন হইব না!’
ধ্রুব বলল, ‘হ্যাঁ, হবে। আপনে চিন্তা কইরেন না—’
দুপুরের ঝাঁঝাল রোদ আমাদের মাথায় এসে পড়ে। আমরা তিনজন ছাদে রোদ নিয়ে বসে থাকি।
২.
তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের কত বছর হলো!
হিসাব করলে ত্রিশ-বত্রিশ বছর হবে। এই দীর্ঘ চেনা-জানা, পরিচয়ের সূত্র ধরে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি আমি। অনেক ঋণী হয়ে আছি তাঁর কাছে। এক অদ্ভুত জীবনযাপন রপ্ত করে নিয়েছিলেন তিনি—যে জীবনযাপনে প্রবেশ করার হিম্মত অনেকের থাকে না। অনেকের হিম্মত থাকলেও সাহস করে সে পথে হাঁটেন না। বুলবুল চৌধুরী জেনে শুনে জীবনের শুরু থেকেই সে পথে হেঁটেছেন। কে কী বলল, কে কী মনে করল, তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। তাঁর ছিল একেবারে নিজস্ব ঘরাণার জীবনপ্রণালি।
বুলবুল চৌধুরী সবার সঙ্গে মিশতে পারতেন। তিনি তাঁর কথাবার্তা আর চালচলন দিয়ে সবাইকে প্রায় সম্মোহিত করে ফেলতে পারতেন। তিনি যখন কারো সঙ্গে কথা বলতেন, সেটা হয়ে উঠত দেখার মতো এক বিষয়। তিনি মানুষের সঙ্গে তাঁর নির্মিত নিজস্ব এক ভাষায় কথা বলতেন—যে ভাষা অসম্ভব শ্রুতিময়।
কেমন ধরনের মানুষ ছিলেন বুলবুল চৌধুরী!
টুকা কাহিনী, জল টুঙ্গি, পাপ পুণ্যি, এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’সহ এরকম আরো কিছু গল্প-উপন্যাসের ভেতর তাঁকে মূল্যায়নের চেষ্টা হয়। কিন্তু এই ক’টা রচনা দিয়ে কি তাঁকে মূল্যায়ন সম্ভব!
স্বাধীনতাপরবর্তী সদ্য স্বাধীন দেশের কথাসাহিত্যে বুলবুল চৌধুরী নীরবে নিভৃতে তাঁর অতুলনীয় গদ্যরীতিতে নির্মাণ করেছিলেন অন্য এক ভুবন। তিনি খুব যে বেশি লিখেছেন তা নয়, কিন্তু যা লিখেছেন তা তাঁকে অন্য দশজনের চেয়ে আলাদা করেছে। বুলবুল চৌধুরী তাঁর গল্প-উপন্যাসের বিষয়-আশয়ে যে আলাদা ভুবন নির্মাণ করেছিলেন তা আমাদের অনেক সাহিত্য-সমালোচকের কাছে অনালোকিতই রয়ে গেছে। তার কারণও বোধ হয় বুলবুল চৌধুরীর মাত্রাতিরিক্ত প্রচার বিমুখতা। আড়ালে থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন তিনি। অন্য দশজনের মতো নিজেকে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিকে-সেদিকে বিক্রি করেননি কিংবা নিজের সর্বস্ব কারো কাছে কিংবা কোনো গোষ্ঠীর কাছে নির্লজ্জ রকমের বন্ধক রেখে সাহিত্যচর্চা করেননি। একেবারে নিজের মতো করে নিজের লেখাটাই সারাজীবন লিখে গেছেন। এখানেই তাঁর সফলতা।
৩.
বুলবুল চৌধুরীকে খুব কাছে থেকে পেয়েছি। খুব আপন করে জেনেছি। তাঁর সঙ্গে শতশত হাজার হাজার স্মৃতি রয়েছে। এমনও সময় গেছে দিনের পর দিন দিনের প্রায় পুরোটা সময় বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে থেকেছি। দেখা গেল বাংলা বাজার থেকে পাশাপাশি বসে রিকশা করে যাচ্ছি নারিন্দার দিকে। বুলবুল ভাই কোনো কথা বলছেন না। পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন, সিগারেট টানছেন—আমি একথা-সেকথা বলে যাচ্ছি। তিনি কথা না বলে তাকিয়ে তাকিয়ে চারদিকের সবকিছু দেখছেন।
‘বুলবুল ভাই, কিছু কইতাছেন না যে—’
‘কী কমু মিয়া! দেখতাছি...’
‘কী দেখতাছেন?’
‘কত্ত কিছু দেহি—’
এরকম অনেকদিনই হয়েছে। ধ্রুব এষও তাঁর এই দেখাদেখির রাজসাক্ষী। পরিচয়ের প্রথম দিকে তাঁর এ দেখাদেখির ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারতাম না। পরে দিন যত গেছে ততই বুঝেছি, বুলবুল চৌধুরী তাঁর দীর্ঘদিনের টানাপড়েনের জীবনে কথা বলার চেয়ে দেখতেই বেশি পছন্দ করেন। কত মানুষ তাঁর উপকার নিয়ে শেষে তাঁর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, তাঁর সঙ্গে চোখ উল্টে কথা বলেছে, কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি।
কিছুকাল বুলবুল ভাই প্রকাশনী ব্যবসা করেছেন— তখন প্রকাশনা সংক্রান্ত নানা ধরনের কাজ তিনি করেছেন। অনেক মানুষ তাঁর কাছে কাজ করিয়ে টাকা না দিয়ে চলে গেছে, যোগাযোগ করলে বাজে ব্যবহার করেছে। ঐ যে বললাম, তিনি দেখতে পছন্দ করতেন তাই তাদের ওরকম দুর্ব্যবহারে, তাদের ওরকম ইতরপনায় তিনি কিছু বলেননি— কেবল দেখেছেন।
বয়স কম আর ঘাড়ের রগ ত্যাড়া থাকার কারণে সেসব কাণ্ডকীর্তি দেখে অনেকবারই বুলবুল ভাইকে বলেছি, ‘আপনি শুধু দেখেন, কিছু বলেন না কেন?’
বুলবুল ভাই জবাবে বলতেন, ‘আরে মিয়া, বুঝবেন না। বিনা পয়সায় মাইনসের চেহারা দেহনের মইধ্যে মজা পাই আমি, সুখ পাই আমি...’
বুলবুল ভাই সারাজীবন লিখে, পুরস্কার-সম্মাননা পেয়ে যত সুখ পেয়েছেন, আনন্দ পেয়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি সুখ পেয়েছেন কাছের দূরের এরকম মানুষদের ব্যবহার দেখে। চেহারা দেখে।
৪.
তাঁকে ঘিরে আমার বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর আড্ডা। এক অদ্ভুত রকমেরর ঘোর লাগানিয়া আর ঘোর জাগানিয়া মানুষ ছিলেন তিনি। ভাবা যায়, একটা মানুষ গোটা জীবন কোনো একটা কাজে থির না থেকে শুধু লেখালেখি করে, আড্ডাবাজি করে, এর-তার উপকার করে করে জীবনটা কাটিয়ে দিলেন! কীভাবে কাটালেন?
সেও এক জাদু। সেও এক সাহসিকতা। সেও এক হ্যাডম—এসব জাদু, সাহসিকতা কিংবা হ্যাডম অনেকের নেই। এটা তাঁর মধ্যে শুরু থেকেই ছিল এবং মরে যাবার আগমুহূর্ত পর্যন্ত বেজায় রকমের ছিল।