পরীমনির দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় রিমান্ড

দুই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ব্যাখ্যা চাইল হাইকোর্ট

চিত্রনায়িকা পরীমনির দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার রিমান্ড মঞ্জুরের জন্য ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের দুই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে হাইকোর্ট। কোন তথ্যের ভিত্তিতে পরীমনিকে এই রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ে তাদের ১০ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন। এছাড়া পরীমনির মাদক মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর মামলার কেস ডকেটসহ (সিডি) তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে হাইকোর্টে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছে, দুই ম্যাজিস্ট্রেট যদি সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারেন, তাহলে তাদেরও তলব করা হবে।

পরীমনিকে তিন দফায় রিমান্ডে নেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের তিন আইনজীবী। ঐ আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট এ আদেশ দেয়। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তার (আইও) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় রিমান্ড মঞ্জুর করা প্রয়োজন? প্রথম চার দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর আইওর কাছে এমন কী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল যে তাকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডে নিতে হবে? আদালত বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা চাইল আর তাতেই কীভাবে সংবিধান ও দেশের অন্যান্য আইন লঙ্ঘন করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ড মঞ্জুর করে দিলেন, মহানগর হাকিম এটা বুঝে আসে না। হাইকোর্ট বলে, পুলিশ বিভাগকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে মানুষের জীবন হচ্ছে খুবই মূল্যবান সম্পদ। কোনো ব্যক্তিকে রিমান্ডে নেওয়ার আগে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রথমেই আইন দেখতে হবে এবং রিমান্ডে নেওয়ার ভিত্তি কী, তা চিন্তা করতে হবে। সর্বোচ্চ বিশ্বাস থেকে এটা বলা দরকার যে পুলিশ বিভাগে সমাজের বিনিয়োগ আছে, যাতে একজন দক্ষ ও আইনের প্রতি বাধ্যগত উচ্চ মানসম্পন্ন পুলিশ কর্মকর্তা গড়ে ওঠে। একজন তদন্ত কর্মকর্তার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া গাইডলাইন অস্বীকার করা বা তার প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ নেই।

শুনানি :রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিজানুর রহমান শুনানিতে বলেন, প্রথমে ডিবি পুলিশ এই আসামিকে (পরীমনি) চার দিনের রিমান্ডে নেয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় বাকি তিন দিন সিআইডি রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে এই আসামি কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। কিছু ব্যক্তির নাম বলেছিল, যাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। যারা মাদক সরবরাহ করত। আদালত বলে, কারা জড়িত তাদের নামের তালিকা তো দেয়নি সিআইডি। অথচ আদালত আদেশে বলেছে, যৌক্তিক কারণে রিমান্ড মঞ্জুর করলাম।

সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তদন্ত সংস্থা তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য প্রকাশ করতে পারে না, যা রেকর্ডে থাকে। এই আসামি সমাজের কিছু লোকের নাম বলেছে। আর কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। এসব যাচাই-বাছাই করতেই সিআইডি তৃতীয় দফা রিমান্ডের আবেদন করে। এ সংক্রান্ত সিডিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য আছে। আদালত তখন বলে, আমরা এসব দেখব।

আবেদনকারীপক্ষে জেড আই খান পান্না বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে পরীমনিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা মেনে তাকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারত। এটা শুধু আদালত অবমাননা নয়, মানবাধিকার-পরিপন্থিও বটে। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, পরীমনিকে কি কোনো নির্যাতন করা হয়েছে? জবাবে ঐ আইনজীবী বলেন, শারীরিকভাবে নির্যাতন করাটাই শুধু নির্যাতন নয়, মানসিক নির্যাতনও একটা নির্যাতন। আদালত বলে, সংবিধান অনুযায়ী আপিল বিভাগের ঠিক করে দেওয়া গাইডলাইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব যথাযথভাবে মানতে হলে যেসব উপকরণ প্রয়োজন তার ঘাটতি রয়েছে আমাদের দেশে। দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারিনি। এটাই বাস্তবতা। শুনানি শেষে পরে আদালত আদেশ দেয়।