বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দক্ষ ও অকুতোভয় পাইলট ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম ছিলেন আকাশে যাত্রীদের নিরাপত্তা-নির্ভরতার আশ্রয়। বিমান পরিচালনায় কঠিন বিপদে পড়লেও তিনি কখনো সাহস হারাননি। ককপিটে বসে হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে দুই দফা অসীম সাহসিকতায় যাত্রীদের জীবন রক্ষা করলেও নিজেই শেষে হেরে গেলেন মৃত্যুর অমোঘ নিয়তির কাছে। অভাবনীয় দক্ষতায় যাত্রীদের প্রাণ বাঁচিয়ে আন্তর্জাতিক পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের প্রশংসাপত্র প্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নওশাদ তার অসামান্য বীরত্বগাথায় অনন্তকাল অমলিন থাকবেন।
গত ২৭ আগস্ট ওমানের রাজধানী মাসকাট থেকে বিজি ০২২ ফ্লাইটটি ১২৪ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে ভারতের রায়পুরের আকাশে থাকাকালে হঠাত্ হার্ট অ্যাটাক করেন ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম। জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন জরুরি অবতরণ করে যাত্রীদের প্রাণ রক্ষার জন্য।
ক্যাপ্টেন নওশাদের কো-পাইলট ছিলেন ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম পিয়াস। তিনি সেই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ফ্লাইটে যাত্রী ছাড়াও আমিসহ দুই জন ককপিট ক্রু ও ছয় জন কেবিন ক্রু ছিলেন। প্রায় ৩৭ হাজার ফুট ওপর দিয়ে ওড়ার সময় হঠাত্ই বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন ক্যাপ্টেন নওশাদ। তিনি জানান, তিনি অসুস্থ বোধ করছেন। আমি কন্ট্রোল নিয়ে কেবিন ক্রুদের জানানোর পর তারা উড়োজাহাজে থাকা মেডিক্যাল বক্স ব্যবহার করে ক্যাপ্টেন নওশাদকে প্রাথমিক চিকিত্সা দিতে থাকেন। এগুলো চিকিত্সকদের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত ফ্লাইটে কোনো ডাক্তার ছিলেন না। বারবার ঘোষণার পরও জানা যায় ফ্লাইটে কোনো ডাক্তার নেই। ইতিমধ্যে ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিংয়ের জন্য কলকাতা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি। এরপর শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করতে হয়েছে। আমরা তার অবস্থা দেখে বুঝতে পারি তিনি সিভিয়ারা হার্ট অ্যাটাক করেছেন। তিনি নিথর হয়ে পড়েন। তার কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না আমরা। বারবার কন্ট্রোল টাওয়ারে যোগাযোগ করতে থাকি। ২০-২৫ মিনিট পর এটিসি থেকে কাছাকাছি নাগপুর এয়ারপোর্টে অবতরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে প্লেনটি দ্রুত নাগপুরের ড. বাবা সাহেব আম্বেদকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে ল্যান্ড করি। আগে থেকেই বিমানবন্দরে অ্যাম্বুলেস প্রস্তুত ছিল। রানওয়েতে নামামাত্র দ্রুত ক্যাপ্টেন নওশাদকে নামিয়ে অ্যাম্বুলেন্স করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেন্স থাকা পর্যন্ত ক্যাপ্টেন নওশাদ সাহস হারাননি। তিনি আমাকে সাহস দিয়েছেন। শান্ত থাকতে বলেছেন।
সেদিনের ভয়াবহ সেই মুহূর্ত বর্ণনা করে এক কেবিন ক্রু বলেন, আমরা ফ্লাইট শুরুর কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেন নওশাদকে খাবার দিয়েছিলাম। তিনি সেই খাবার খান। পরে ককপিট থেকে ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম জানান, ক্যাপ্টেন নওশাদ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কো-পাইলট মোস্তাকিম পিয়াস মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে দ্রুত জরুরি অবতরণের জন্য কন্ট্রোল টাওয়ারে যোগাযোগ শুরু করেন। আর আমরা কেবিন ক্রু-রা মেডিক্যাল ইমার্জেন্সের এসওপি অনুযায়ী কেবিনে কোনো চিকিত্সক আছে কি না জানতে চাই। তবে ফ্লাইটে কোনো ডাক্তার না থাকায় আমরা নিজেরাই সেগুলো ব্যবহার করে ক্যাপ্টেন নওশাদকে প্রাথমিক চিকিত্সা দিতে থাকি। ইতিমধ্যে পুরোই নিথর হয়ে যান। আমরা ফার্স্ট অফিসারকে সাহস যোগানোর চেষ্টা করেছি, তিনিও দৃঢ়ভাবেই ফ্লাইট অপারেট করেছেন।’
ক্যাপ্টেন নওশাদের মরদেহ বহনকারী ফ্লাইটের পাইলট ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরান বলেন, তার মতো মানুষকে আমরা সব সময় মিস করব। বিমানের জন্য সে ছিল সম্পদ। একজন দক্ষ পাইলটকে শুধু হারাইনি, একজন ভালো মানুষকেও হারিয়েছি আমরা।
ক্যাপ্টেন ইমরান ব?লেন, নওশাদ ও তার ফার্স্ট অফিসারের কারণে ২৭ আগস্ট জীবন রক্ষা পেয়েছিল ওমান থেকে ঢাকার উদ্দেশে আসা ১২৪ যাত্রীর। তবে এটিই প্রথম নয়, পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালে আরেকটি দুর্ঘটনার হাত থেকে ১৪৯ যাত্রী আর সাত ক্রুর জীবন বাঁচিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ।
ক্যাপ্টেন নওশাদ বেশি পছন্দ করতেন কাচ্চি বিরিয়ানি
বন্ধুদের কাছে মিশু নামেই পরিচিত ছিলেন নওশাদ। ক্যাপ্টেন আব্দুল কাইয়ুমের একমাত্র ছেলে নওশাদ আতাউল। নওশাদের বাবার বন্ধু বদরুল আলম। তিনি বলেন, ‘খুব শান্ত ছেলে, চুপচাপ থাকত। ছোট থেকেই তার মধ্যে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল। বাবার ক্যাপ মাথায় দিয়ে ঘুরত।’
বদরুল আলম বলেন, আমার বন্ধু কাউয়ুম মারা গেল এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। নওশাদ এত দ্রুত চলে গেল, আমাদের জন্য এটা বজ্রপাতের মতো। আমি জানি না এই শোক কীভাবে তার পরিবার সইবে।
নওশাদের স্কুলবন্ধু নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। উত্তরার বাড়িতে বন্ধুকে শেষ বিদায় জানাতে যান। অমিতাভ রেজা বলেন, স্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম। সে খেলতে পছন্দ করত, ফুটবল খেললে গোলকিপার থাকত। ছোটবেলায় কাগজের বিমান বানিয়ে ঘুরত। তার আরেক ছোট বেলার বন্ধু খন্দকার মোহাম্মদ জিয়া বলেন, কারো কোনো বিপদের কথা শুনলেই সে এগিয়ে গিয়েছে। কাউকে কোনো দিনও খারাপভাবে কথা বলত না। খুবই মিষ্টভাষী ছিল। খেতে ভালোবাসতেন নওশাদ।
তার বন্ধু রানা বলেন, বাসায় আসার কথা বললেই বলত কী খাওয়াবি। কাচ্চি বিরিয়ানি পছন্দ করত বেশি। কিছুদিন আগেই আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করল, কী রান্না করেছি? ছোট মাছ ছিল বলে আসেনি। হেসে বলে, ভালো খাবার না থাকলে বাসায় যাব না। সহকর্মীদের কাছেও প্রাণবন্ত মানুষ ছিল ক্যাপ্টেন নওশাদ।
বিমানের ডেপুটি চিফ অব ট্রেনিং ক্যাপ্টেন আনিস আহমেদ বলেন, একজন পাইলট তৈরি হতে ১০-১৫ বছর লেগে যায়। তার নেশার মধ্যে ছিল ফ্লাই করা। তার মতো পাইলটের চলে যাওয়ায় বিমান সম্পদ হারিয়েছে।