সেবাচিমের দুরবস্থা ঘুচিবে কবে

সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকের এক রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, বিভাগীয় শহর বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটটি বিগত দেড় বত্সর ধরিয়া বন্ধ রহিয়াছে। কারণ হিসাবে বলা হইয়াছে, এই ইউনিটটি ২০১৫ সালে প্রায় একক প্রচেষ্টায় গড়িয়া তুলিয়াছিলেন ডা. এম এ আজাদ। তাহার রহস্যজনক মৃত্যুর পর সর্বশেষ রোগী চিকিত্সা গ্রহণ করিয়াছেন গত বত্সর ১৫ মে। উল্লেখ্য, ইউনিটটি চালু থাকা অবস্থায় প্রায় পাঁচ বত্সরে দক্ষিণ অঞ্চলের ৫ হাজার রোগী চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করিয়াছে। প্রাথমিকভাবে আট শয্যাবিশিষ্ট হইলেও রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউনিটটি ৩০ শয্যায় উন্নীত করা হইয়াছিল। অথচ তাহাই এখন পুরোপুরি বন্ধ! বর্তমানে ঐ ইউনিটে এক বা দুই জন নার্স যাতায়াত করেন এবং সেইখানে দগ্ধ কোনো রোগী আসিলে তাহাদের বিভিন্ন স্থানে যাইবার পরামর্শ দেন। ঢাকায় রেফার করিবার ব্যবস্থা করেন।

বিস্তারিত খোঁজ লইয়া জানা গিয়াছে, শুধু বার্ন ইউনিট নহে, এই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা এক চরম অবস্থায় পৌঁছাইয়াছে। বিশাল হাসপাতালের ব্যয়বহুল এমআরআই মেশিন পাঁচ বত্সর ধরিয়া বন্ধ থাকিবার পর ন্যাশনাল ইলেক্ট মেডিক্যাল ওয়ার্কশপ পরিদর্শন করিয়া তাহা অচল বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। ইহা ছাড়া সিটিস্ক্যান, এনজিওগ্রাম, আলট্রাসোনোগ্রাম বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারিজ অকেজো হইয়া পড়িয়া আছে। অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল দুইটি সিটি স্ক্যান মেশিন যথাক্রমে এক বত্সর ও দুই বত্সর ধরিয়া অকেজো। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে বিকল হওয়া দুইটি আলট্রাসোনোগ্রাম মেশিন আর সচল হয় নাই। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগের সিনিয়র চিকিত্সকরা বিভাগীয় শহরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চেম্বার খুলিয়া বসিয়াছেন। কোভিডের সংক্রমণের সংখ্যা যখন চরমে, তখনো দেখা গিয়াছে নানা অব্যবস্থাপনা। অক্সিজেন সরবরাহের যে ট্যাংকটি বিদ্যমান ছিল তাহা রোগীর সংখ্যার তুলনায় ছিল অপর্যাপ্ত। ১০ হাজার লিটারের আরেকটি ট্যাংক বসানো হইলেও তাহা সংযোগবিহীন ছিল দীর্ঘদিন। অবশ্য ইহাও জানা গিয়াছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তাহাদের চাহিদাপত্র অধিদপ্তরে প্রেরণ করিতেছেন। কিন্তু অধিদপ্তর হইতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ইতিবাচক সমাধান পাওয়া যায় না। 

দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের নানা প্রতিবন্ধকতা লইয়া অধিদপ্তরে জ্ঞাত করিবার পরও যদি কোনো সমাধান পাওয়া না যায়, তাহা হইলে অধিদপ্তর রহিয়াছে কেন? বড়বড় দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা রহিয়াছেন কেন? থাকিবারই দরকার কী? দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর সবচাইতে বড় ভরসার স্থল এই হাসপাতাল। বিভাগের ছয় জেলার পাশাপাশি মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরের অনেক রোগী এই হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য ছুটিয়া আসে। কোভিড রোগী বৃদ্ধি পাইলে শেরে বাংলা মেডিক্যালে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে সেবাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হইলেও এই হাসপাতালের স্থায়ী সমস্যাগুলির ব্যাপারে ধীরগতি মোটেই কাঙ্ক্ষিত নহে। কোভিড একটি আপত্কালীন বিষয়। কিন্তু হাসপাতালে নানা ধরনের রোগীর সঠিক চিকিত্সার জন্য যে পরীক্ষা মেশিন, সেইগুলি অকেজো থাকা সেকেলে চিকিত্সা ব্যবস্থারই নামান্তর। বরিশালসহ ১০টি জেলার ২ কোটির অধিক বাসিন্দার ভরসাস্থল এই হাসপাতালের সঙ্গে অধিদপ্তরের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা, প্রয়োজনগুলি চিহ্নিত করা এবং সমাধান করা অধিপ্তরের অপরিহার্য কর্তব্য বলিয়া আমরা মনে করি। দেশ আধুনিক হইতেছে। চিকিত্সার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অনাধুনিক কর্মকাণ্ড, অনাধুনিক মানসিকতা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নহে। অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের ইহা বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।