বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে অনেকে বোঝা হিসেবে উল্লেখ করেন। অনেকে বক্তৃতা বিবৃতিতে এই জনগোষ্ঠীকে অভিশাপ হিসেবে আখ্যা দিতেও কুণ্ঠা বোধ করেন না। কিন্তু এই জনসংখ্যা যে আমাদের জন্য আশীর্বাদ, সেটা অনেকেই চেপে যান। এখানে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে চারদিকে অভাব-অনটন। সাত লক্ষ মানুষের অন্ন বস্ত্র জোগাড় করতেই নতুন সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। তখন বঙ্গবন্ধু এক জনসভায় দৃঢকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার দেশের অভাব থাকতে পারে না। কারণ আমাদের রয়েছে সোনার মাটি আর সোনার মানুষ। এই সোনার মানুষই একদিন দেশ বদলে দেবে।’ বঙ্গবন্ধুর এই কথা সেদিন অনেকেই অনুধাবন করতে পারেননি। কিন্তু দিন যত এগিয়েছে বঙ্গবন্ধুর কথাই আমোঘ সত্যিতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের যত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, তা এসেছে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর হাত ধরেই। কিন্তু দীর্ঘদিনের এই অর্জন অনেকটা ম্লান হতে চলেছে একটি সমস্যাকে ঘিরে। সেটি হচ্ছে মাদক। গত দুই দশকে এই সমস্যা আমাদের ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে।
সাধারণত মাদকের বিস্তারকে আমরা সব সময় সামাজিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে আসছি। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। মাদক সমস্যা যতটা না সামাজিক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর শত শত উদাহরণ রয়েছে। বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে মাদক সমস্যা এতই প্রকট যে, সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করেছে। তার পরও দেশগুলো এ সমস্যা থেকে বের হতে পারেনি। এই কিছুদিন আগেও ফিলিপাইনের সরকার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মাদক সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে। সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিজের হাতে মাদক কারবারিদের গুলি করে মেরেছেন। মাদক বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটি প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করছে মাদক নির্মূলে। এমনকি মাদক উত্পাদনকারী দেশগুলোতে সৈন্য পাঠিয়ে তারা উত্স ধ্বংস করতে তত্পর রয়েছে। মাদক সমস্যা এত ভয়াবহ যে, এটির এখন কোনো ভৌগোলিক দিগ্বিদিক নেই। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যারা এই সমস্যা মোকাবিলা করছে না।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাদকের সমস্যা আরো ভয়াবহ। মাদক কারবারিদের হাতে দ্রুত কাঁচা টাকা চলে যাওয়ার কারণে সোশ্যাল হারমনি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমাদের। এদের অনেকে আবার রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ক্ষমতার স্বাদ নিচ্ছে। মাদক কারবারিরা কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ার কারণে এদের নির্মূল সহজ হয় না। রাজনীতি করার কারণে প্রশাসনও এদের ঘাঁটাতে চায় না। আবার অনেক সময় দেখা যায়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশ করেও বর্তমানে মাদক পরিবহন এবং ব্যবসায় পরিচালিত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে এ ধরনের দু-একটি ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। গ্রামগঞ্জে, পাড়া মহল্লায় বিভাগীয় শহর এমনকি খোদ রাজধানীতে মাদকের বিস্তার এখন সর্বনাশা হয়ে উঠেছে।
একসময় যুবসমাজের কাছে মাদকাসক্তি মানেই ছিল গাঁজা। এরপর ফেনসিডিল, ইয়াবা জাতীয় মাদক সীমান্তবর্তী দেশগুলো থেকে দেদার প্রবেশ করেছে। যুবসমাজের একটি বড় অংশ, যার অধিকাংশই ছাত্রছাত্রী এই সর্বনাশা মাদকের খপ্পরে পড়ে লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ছে। সাম্প্রতিক কালে কয়েকটি বিশেষ ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। পুলিশের জালে মাঝেমধ্যে কিছু মাদক ধরা পড়েছে ঠিকই কিন্তু নানা অদৃশ্য বোঝাপড়ায় অনেক মাদক থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন (স্বল্পোন্নত দেশে রূপান্তর)-এর দ্বারপ্রান্তে। বিপুল জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক উন্নতি তা আমাদেরকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু সবকিছু ম্লান হয়ে যাবে, যদি আমরা মাদক নির্মূল করতে না পারি। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, একটি ঘরে যদি ১০ জন স্কলার থাকে, তারা যদি সবাই মাদকাসক্ত হয়, তাহলে সে বাড়িতে খাবার জুটবে না। আবার ঐ ১০ জনের মধ্যে এক জন যদি স্কলার হয় এবং সে যদি মাদকাসক্ত না হয়, তাহলে সে ঘরে খাবার জুটবে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে কারা মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত, কারা মাদক গ্রহণ করে তা প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের অনেকেই জানেন। কিন্তু আমরা সচেতন সমাজ অনেক সময় চুপ করে থাকি। মনে রাখতে হবে, আমরা যদি চুপ করে থাকি, তাহলে আমরা প্রকারান্তরে নিজেদের বিপদই ডেকে আনছি। রাজনীতিবিদ তথা জনপ্রতিনিধিরা এবং প্রশাসনের লোকজন এ বিষয়ে তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। মনে রাখতে হবে, এভাবে চলতে থাকলে জাতীয় রাজনীতিতে মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতিফলন হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সব খবরই রাখেন। তিনি যদি অতি দ্রুত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মাদক নির্মূলের নির্দেশনা না দেন, তাহলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনবোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। কারণ মাদকের এই সমস্যা নির্মূল করতে না পারলে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা করার ঘোষণা কাগজে কলমেই থেকে যাবে।
n লেখক :সাবেক সহসভাপতি, বিজিএমইএ