হাওর-জলাশয় ভরাট হয়ে নষ্ট হচ্ছে মাছের আবাসস্থল

সিলেটে নতুন বিপদ অম্ল পানি ও বালি

হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী, সিলেট অফিস

দেশের মিঠা পানির মাছের অন্যতম উত্স সিলেটের হাওরগুলো অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কিন্তু পার্শ্ববর্তী ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে নেমে আসা বালিতে জলাশয় ভরাট হয়ে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি মাছের আবাসস্থলও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ৪৬ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়া অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, কীটনাশকের ব্যবহার, অবাধে মত্স্য নিধন, পাহাড় থেকে নেমে আসা কয়লার খনি, অম্ল পানিতে নদী, হাওর ও জলাশয়ে মারাত্মক দূষণের তথ্য উঠে এসেছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যায়ের মত্স্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুন্ডের গবেষণায়। 

মত্স্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিদ্যমান জনবল কাঠামোর আকার বৃদ্ধি, উল্লেখিত বাধাগুলো দূর হলে বৃহত্তর সিলেটে মাছের উত্পাদন আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। তারা বলেন, বিশেষ করে সিলেটে একটি মত্স্য গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা জরুরি। সিলেট বিভাগীয় মত্স্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, প্রায় বিলুপ্ত পাবদা, রাণী, মেনি মাছ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

বিভাগীয় মত্স্য বিভাগ সূত্র জানায়, সিলেটে ৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৫৬ হেক্টর হাওর, বিল ও জলাশয় রয়েছে। ২০১৮ সালে সিলেট বিভাগের চার জেলায় মাছের উত্পাদন ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার ৬২৭ মে. টন। চাহিদা ২ লাখ ১৪ হাজার ৭৭৩ মে. টন। এই হিসাবে উদ্বৃত্ত ৫৫ হাজার ৮৫৩ দশমিক ৭০ টন। ‘৮০ দশকেও সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়াসহ বিভিন্ন হাওরে মাছ কিলবিল করত। নৌকায় চলার পথে মাছ গায়ের ওপর এসে পড়ত,’ মন্তব্য করে সাবেক এমপি নাজির হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘হাওরে লুট-পাট বন্ধ করে পরিকল্পিত উপায়ে মাছ চাষ ও অভয়াশ্রমগুলোকে নিরাপদ করলে, হাওরগুলো হতে পারে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের টার্নিং পয়েন্ট।’

মত্স্য অধিদপ্তর সিলেটের উপ-পরিচালক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘পুকুর, বদ্ধ জলাশয়ে মাছের উত্পাদন বাড়লেও হাওরে প্রাকৃতিক ভাবে সেভাবে বাড়ছে না। তবে যথাযথ উদ্যোগ-বাস্তবায়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধি হলে সিলেট অঞ্চলে মাছের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সূত্র জানায়, ২০১১ সাল থেকে বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে একটি প্রকল্প হাতে নেয় মত্স্য অধিদপ্তর। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ, প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও একই লক্ষ্যে হাওর এলাকায় কাজ করছে।

মত্স্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন, সেচের মাধ্যমে মত্স্য আরোহন, জলাশয়ে যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি, জলবায়ুর পরিবর্তন, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারসহ নানা কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

জেলা মত্স্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, সিলেট জেলায় বছরে মাছের চাহিদা ৭২ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। উত্পাদন হয় ৭৫ হাজার ৪২৭ মেট্রিক টন। এ জেলায় চাহিদার চেয়ে উত্পাদন ২ হাজার ৫১৫ মেট্রিক টন বেশি। তিনি আরো জানান, এ অঞ্চলে হাওর-জলাশয়ের সংখ্যা অনেক। পরিকল্পিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে মাছের উত্পাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। তিনি জানান, দেশে ২৬০ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছের মধ্যে সিলেট অঞ্চলে ৮০ থেকে ৯০ প্রজাতির মাছ এবং ১০ থেকে ১৫ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া যায়। তবে, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট এবং বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে দিন দিন এ অঞ্চলে মাছের উত্পাদন কমে যাচ্ছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে।