পাঞ্জশিরে তীব্র লড়াই, সরকার গঠনের সময় পেছাল তালেবান

আফগানিস্তানের পাঞ্জশিরে তীব্র লড়াই এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেই সরকার গঠন করছে তালেবান। আজ শনিবার সরকার গঠন করা হতে পারে। সরকারের নেতৃত্বে থাকছেন আবদুল ঘানি বারাদার। সরকার হবে ইরানের আদলে, যেখানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে মূল ভূমিকা পালন করেন, এমনকি প্রেসিডেন্টের চেয়েও তিনি বেশি ক্ষমতাবান। এদিকে চীনকে প্রধান অংশীদার বলে আখ্যায়িত করেছে তালেবান। খবর আলজাজিরা ও চ্যানেল নিউজ এশিয়ার

শুক্রবারই সরকার গঠনের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। তবে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, শনিবার সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হবে। তালেবানের তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক কমিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মুফতি ইনামুল্লাহ সামানগানি বলেছেন, নতুন সরকার নিয়ে আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত এবং মন্ত্রিসভার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা হয়েছে। ইরানের মতো একটি কাউন্সিল থাকবে, যার সর্বোচ্চ নেতা হতে পারেন হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। আর সরকারের প্রধান হবেন আবদুল ঘানি বারাদার। তার সঙ্গে সরকারের সিনিয়র পর্যায়ে ভূমিকা পালন করবেন মোল্লাহ মোহামাদ ইয়াকুব ও শের মোহাম্মদ আব্বাস স্তানিকজাই। তালেবানের তিনটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে, তালেবানের সিনিয়র নেতারা ইতিমধ্যেই কাবুলে পৌঁছেছেন। আরেকটি সূত্র জানায়, এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে, যেখানে কেবল তালেবানের সদস্যরাই অংশ নেবেন। এই সরকারে ২৫ জন মন্ত্রী থাকবেন এবং একটি পরামর্শক বা শুরা কাউন্সিল থাকবে, যাতে ১২ জন ইসলামি ব্যক্তিত্ব থাকবেন। ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে একটা লয়া জিরগা বা গ্র্যান্ড অ্যাসেম্বলি গঠন করা হবে। এখানে সমাজের বিভিন্ন সিনিয়র নেতা এবং প্রতিনিধি অংশ নেবেন। তারা ভবিষ্যত্ সরকার কেমন হবে তা নিয়ে আলোচনা করবেন।

পাঞ্জশিরে তীব্র লড়াই, কাবুলে নারীদের বিক্ষোভ

পাঞ্জশির উপত্যকায় তালেবানের সঙ্গে স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনীর তীব্র লড়াই চলছে। এই উপত্যকা আফগানিস্তানের একমাত্র অঞ্চল, যা এখনো তালেবানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দেওয়া মিলিশিয়া বাহিনী বলছে, তালেবানের কয়েক শ যোদ্ধাকে হত্যা করে তারা তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছে। বৃহস্পতিবার তালেবানের একজন মুখপাত্র দাবি করেন যে তাদের যোদ্ধারা পাঞ্জশির উপত্যকায় ঢুকে পড়েছে। ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের দাবি, তালেবানের হাত থেকে তারা পাঞ্জশির উপত্যকার বাইরে নতুন কিছু এলাকাও দখল করে নিয়েছে। এই মিলিশিয়া বাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেছেন যে তারা ৫০ জনেরও বেশি তালেবান যোদ্ধাকে আটক করেছেন। তিনি বলেন, পারওয়ান প্রদেশের চারিকর শহর এখন ন্যশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের নিয়ন্ত্রণে। তালেবানের শীর্ষ একজন নেতা আমির খান মোতাকি পাঞ্জশির উপত্যকার বাসিন্দাদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানকার স্থানীয় বিদ্রোহীরা তাতে সাড়া দিয়েছেন, এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

গতকালও পাঞ্জশিরে লড়াই চলে। এর ফলে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে। ৫২ বছর বয়সি আসাদুল্লাহ নামের একজন জানিয়েছেন, প্রতি রাতেই লড়াই চলে। বিশেষ করে, পার্বত্য এলাকায় লড়াইটা বেশি হয়। পাঞ্জশিরে তালেবানবিরোধী ফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আহমাদ মাসুদ। এদিকে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত কাবুলে বিক্ষোভ শুরু করেছেন নারীরা। আফগান অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামনে করা এই বিক্ষোভে সরকারে নারীর অংশগ্রহণ ও সংবিধান পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন তারা। কাবুলে গতকাল গোলাগুলির খবর পাওয়া গেলেও এর কারণ জানা যায়নি। হেরাতে চাকরি ও শিক্ষায় সমানাধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন নারীরা। দেশটিতে আড়াই শর মতো নারী বিচারক আছেন। তারা আতঙ্কে আছেন তালেবান সরকার গঠনের পর তাদের চাকরি থাকবে কি না।

স্বীকৃতি দেবে না পশ্চিমা বিশ্ব

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল বলেছেন, তারা আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে এখনই স্বীকৃতি দেবে না। একই মত দিয়েছেন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমিনিক রাবও। তবে তারা তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় রাজি বলে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তালেবানকে একেবারে প্রত্যাখ্যানও করা হচ্ছে না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও জানিয়েছিল, তারা শর্তসাপেক্ষে তালেবানকে স্বীকৃতি দিতে পারে। তবে তালেবান সরকার গঠনের পর কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় সেদিকে লক্ষ্য রাখবে ওয়াশিংটন। এদিকে কাবুল বিমানবন্দর আবার চালু হচ্ছে। বিশেষ করে ত্রাণ সহায়তা আসার করিডোর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে খুলে দেওয়া হতে পারে। ইতিমধ্যে তালেবান সরকার এবং বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে আলোচনা করতে কাতারের একজন প্রতিনিধি কাবুলে পৌছেছেন।

আত্মগোপনে নারী ক্রিকেটাররা

আফগানিস্তানে নারী ক্রিকেট দলের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। ক্ষমতায় আসার পরই তালেবান তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করে। অ্যাসেল (ছদ্মনাম) নামের একজন ক্রিকেটার জানিয়েছেন, তারা সবাই আতংকে আছেন। কাবুলের অবস্থা খুব খারাপ। তারা কেউ নিরাপদ নন। তিনি জানান, তারা প্রতি রাতেই হোয়াটসঅ্যাপে আলোচনা করেন এবং সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা ক্রমেই আশাহত হচ্ছেন।