‘সেন্স থাকা পর্যন্ত সাহস হারাননি ক্যাপ্টেন নওশাদ’

সেদিন আকাশ ছিল ঝকঝকে। সমতল থেকে ৩৭ হাজার ফুট ওপর দিয়ে ফ্লাই করছিলাম আমরা। আমাদের গন্তব্য ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট। যাত্রী ছিল ১২৪ জন। দুই জন ককপিট ক্রু আর ছয় জন কেবিন ক্রু। ফ্লাইট নং বিজি ০২২। ওমানের মাসকাট থেকে উড়ে এসে বোম্বে ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজন পেরিয়ে কেবল প্রবেশ করেছি আকাশপথের কলকাতা রিজনে। হঠাত্ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন ক্যাপ্টেন নওশাদ। তিনি জানান, অসুস্থ বোধ করছেন। এরপর নিথর হয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত ককপিটের কন্ট্রোল নেন সঙ্গে থাকা কো-পাইলট ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম   পিয়াস, ঘোষণা করেন মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। কেবিন ক্রুরা ছুটে এসে বিমানে থাকা মেডিক্যাল বক্স ব্যবহার করে ক্যাপ্টেন নওশাদকে প্রাথমিক চিকিত্সা দিতে থাকেন। দুর্ভাগ্যবশত ফ্লাইটে কোনো ডাক্তার ছিলেন না। মোস্তাকিম পিয়াস ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিংয়ের জন্য কলকাতা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এরপর শ্বাসরুদ্ধকর কিছু সময় পার হতে থাকে।

এভাবেই ইত্তেফাকের কাছে সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করছিলেন ক্যাপ্টেন নওশাদের সহকর্মী ককপিট ক্রু ও কেবিন ক্রুদের কয়েক জন। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপার মেধাবী তরুণ পাইলট ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম পিয়াস বললেন, বাংলাদেশের ফ্লাই ইতিহাসে ককপিটে এমন ঘটনা ঘটেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্রু বললেন, ‘সেই সময় আমরা ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুমের অবস্থা দেখে বুঝতে পারি তিনি সিভিআর হার্ট অ্যাটাক করেছেন। তার কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না আমরা। বারবার কন্ট্রোল টাওয়ারে যোগাযোগ করেন মোস্তাকিম। ২০-২৫ মিনিট পর কলকাতা এটিসি থেকে কাছাকাছি নাগপুর এয়ারপোর্টে অবতরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্লেনটি নাগপুরের ড. বাবা সাহেব আম্বেদকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে ল্যান্ড করান তিনি। আগে থেকেই বিমানবন্দরে অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত ছিল। রানওয়েতে নামামাত্র দ্রুত ক্যাপ্টেন নওশাদকে নামিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেন্স থাকা পর্যন্ত ক্যাপ্টেন নওশাদ সাহস হারাননি। তিনি সাহস দিয়েছেন।’

সেদিনের ভয়াবহ সেই মুহূর্ত বর্ণনা করে এক কেবিন ক্রু বলেন, ‘আমরা কো-পাইলট মোস্তাকিম পিয়াসকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করেছি, তিনিও দৃঢ়ভাবেই ফ্লাইট অপারেট করেছেন। এমন ভয়ংকর পরিস্থিতিতে কো-পাইলট ফ্লাইট অপারেশনে সাহসিকতা ও দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।’

ভারত থেকে ক্যাপ্টেন নওশাদের মরদেহ বহনকারী ফ্লাইটের পাইলট ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরান বলেন, ‘তার মতো মানুষকে আমরা সব সময় মিস করব। বিমান তাকে মিস করবে। বিমানের জন্য সে ছিল বড় সম্পদ।’ তিনি ব?লেন, ‘পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালে আরেকটি দুর্ঘটনার হাত থেকে ১৪৯ যাত্রী আর সাত ক্রুর জীবন বাঁচিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ। আন্তর্জাতিক পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের প্রশংসাপত্র পাওয়া ক্যাপ্টেন নওশাদ তার অসামান্য বীরত্বগাথায় অনন্তকাল অমলিন থাকবেন।’

বৃহস্পতিবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ক্যাপ্টেন নওশাদকে চিরবিদায় জানান বিমানের পাইলট, কেবিন ক্রু ও স্বজন-শুভানুধ্যায়ীরা। মাঝ আকাশে হার্ট অ্যাটাক করার পর সরকার তার সর্বোচ্চ চিকিত্সার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। 

ভোজনরসিক ছিলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ :বন্ধুদের কাছে মিশু নামেই পরিচিত ছিলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ। ক্যাপ্টেন আব্দুল কাইয়ুমের একমাত্র ছেলে নওশাদ আতাউল। বাবাও একসময় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন ছিলেন। ছোট বেলায় বাবার ক্যাপ মাথায় দিয়ে ঘুরতেন নওশাদ। সেই স্মৃতির কথা বললেন নওশাদের বাবার বন্ধু বদরুল আলম। তিনি বলেন, ‘খুব শান্ত ছেলে, চুপচাপ থাকত। ছোট থেকেই তার মধ্যে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল। বাবার ক্যাপ মাথায় দিয়ে ঘুরত। আমার বন্ধু কাইয়ুম মারা গেল এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। নওশাদ এত দ্রুত চলে গেল, আমাদের জন্য এটা বজ পাতের মতো। আমি জানি না এই শোক কীভাবে তার পরিবার সইবে।’

বিমানের ডেপুটি চিফ অব ট্রেনিং ক্যাপ্টেন আনিস আহমেদ বলেন, একজন পাইলট তৈরি হতে ১০-১৫ বছর লেগে যায়। ফ্লাই করা তার নেশা ছিল। তার মতো পাইলটের চলে যাওয়ায় বিমান সম্পদ হারিয়েছে।

নওশাদের স্কুলবন্ধু নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘স্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম। সে খেলতে পছন্দ করত, ফুটবল খেললে গোলকিপার থাকত। ছোটবেলায় কাগজের বিমান বানিয়ে ঘুরত।’ তার আরেক ছোট বেলার বন্ধু খন্দকার মোহাম্মদ জিয়া বলেন, ‘কারো কোনো বিপদের কথা শুনলেই সে এগিয়ে গিয়েছে। কাউকে কোনো দিনও খারাপভাবে কথা বলত না। খুবই মিষ্টভাষী ছিল।’ তার বন্ধু রানা বলেন, ‘খেতে ভালোবাসত নওশাদ। কাচ্চি বিরিয়ানি পছন্দ করত বেশি।’