মেট্রোরেল স্বপ্ন নয়, দৃশ্যমান

স্বপ্নের মেট্রোরেল যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। যে কয়েকটি মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে বিশ্বের দুয়ারে বাংলাদেশের অবস্থান পালটে যাচ্ছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি প্রজেক্ট হলো মেট্রোরেল। মেট্রোরেল এখন আর স্বপ্ন নয়, দৃশ্যমান এক বাস্তবতা। ইতিমধ্যে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক ট্রায়াল শুরু হয়েছে।  মেগাসিটি ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দাপিয়ে বেড়াবে দেশের প্রথম মেট্রোরেল—সেদিন আর বেশি দূরে নয়।

দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যোগাযোগব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে মেট্রোরেল। যানবাহন, যানজট আর গণপরিবহন সমস্যার এই শহরে বসবাসরত কোটি মানুষের দৃষ্টি এখন এই প্রকল্পের দিকে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, মেট্রোরেলের মাধ্যমেই হয়তো শেষ হতে যাচ্ছে যানজটে আক্রান্ত সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। বর্তমান মেট্রোরেল প্রকল্পটি দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এই লাইন ভবিষ্যতে আবার মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত বর্ধিত করা হবে। এছাড়া এমআরটি-১, এমআরটি-২, এমআরটি-৪ এবং এমআরটি-৫ (উত্তর ও দক্ষিণ লাইন) নামে আরো চারটি মেট্রোরেল লাইন তৈরির পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এখন মূলত ভায়াডাক্টের কোথাও কোনো সমস্যা আছে কি না, বিদ্যুত্ সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, কোথাও কোনো মেকানিক্যাল, টেকনিক্যাল, বৈদ্যুতিক সমস্যা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মেট্রোরেল শতভাগ বিদ্যুতের সাহায্যে চলবে। সংকেত, যোগাযোগসহ মোট ১৯টি বিষয় রেল চলাচলের ক্ষেত্রে একত্রে কাজ করবে। এখন সবগুলো বিষয়ের ওপর সমন্বিত পরীক্ষা চালানো হবে। যখনই প্রয়োজন হবে তখনই এ ধরনের পরীক্ষা চলবে। ভায়াডাক্টের বিভিন্ন অংশের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ উদ্বোধনের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত চলমান থাকবে। এরপর হবে ‘ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট’। তবে মেট্রোরেল যাত্রী পরিবহণের উপযোগী হতে আরো অন্তত ১৬ মাস সময় লাগবে। সবকিছু ঠিক থাকলে উত্তরা-মতিঝিল রুটের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু হওয়ার কথা আগামী বছরের ডিসেম্বরে। রাজধানীবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দিনটির জন্য।

যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত যোগাযোগকাঠামোর প্রভূত উন্নতি। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হলেই একটি দেশ উন্নয়নের পরবর্তী ধাপগুলোতে প্রবেশ করতে পারে। আর একটি দেশের রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থার ওপর পুরো দেশের যোগাযোগব্যবস্থার চিত্র ফুটে ওঠে বহির্বিশ্বে। রাজধানীতে যদি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে না ওঠে, তবে তা সামগ্রিকভাবেই দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমকে ব্যাহত করবে এমনটি বলা অযৌক্তিক নয়। সংগত কারণেই রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। রাজধানীর সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি গণপরিবহন। এই সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগী হয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরও সেগুলো খুব একটা আলোর মুখ দেখেনি। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা দীর্ঘ এই ভোগান্তি থেকে আজও মুক্তি মেলেনি। শুধু যানজটই নয়, অযাচিত, অনিয়ন্ত্রিত ও ফিটনেস বিহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য বিগত কিছু বছর ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রবণতা প্রবল ছিল। দুর্ভোগ যেন ঢাকা মহানগরীর মানুষের নিত্যসঙ্গী।

মেট্রোরেল চালু হলে গণপরিবহনের অভাব তো  অনেকাংশে দূর হবেই, সেই সঙ্গে সড়কে ভোগান্তির অবসান হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সব কয়টি লাইনের কাজ সম্পন্ন হলে রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে সন্দেহ নেই। নগরবাসীর মূল্যবান সময়ও অনেকাংশে বেঁচে যাবে। প্রচণ্ড যানজট ও গাড়ির হর্নে বিরক্ত হয়ে নগরবাসী যে মেট্রোরেলের আশায় দিন গুনছে, অবশেষে শেষ হতে যাচ্ছে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার। যানজট ও গণপরিবহনের অযাচিত চলাচলের কারণে যে পথ পাড়ি দিতে হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যেত, শিগিগরই তা মিনিটের হিসাবে গণনা করার সময় এসে গেছে। রাজধানীর যানজট নিরসনে উড়ালসড়ক, বাসের বিশেষ লেন নির্মাণসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বিশ্ব জুড়ে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ও গণপরিবহনে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে দেখা হয় মেট্রোরেলকে। যানজট নিরসন, একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যায় যাত্রী দ্রুত পরিবহনের জন্য মেট্রোরেল বেশ সমাদৃত। ফলে ঢাকা মহানগরীর জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে মেট্রোরেল প্রকল্পের মাধ্যমে। কয়েক বছর আগে মানুষ যা কল্পনাও করতে পারেনি, আজ তা চোখের সামনে দৃশ্যমান। মেট্রোরেলের কাজ দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। সেই সঙ্গে প্রত্যাশায় স্বপ্ন বুনছে সবাই। এইতো আর কিছুদিন পর থেকে অফিস-আদালত কিংবা স্কুল-কলেজের যাত্রায় রাজধানীবাসীর নিত্যসঙ্গী হবে মেট্রোরেল। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই সময়ে পদ্মা সেতুর পর মেট্রোরেলের মতো বড় একটি প্রজেক্টে সফলতা অর্জন জাতি হিসেবে আমাদের অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে। এভাবেই দেশের প্রতি আমাদের প্রত্যাশার পারদ বাড়তে থাকুক। এই উন্নয়নের পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রতিটি ক্ষেত্রে এ দেশ আরো এগিয়ে যাবে—এটাই প্রত্যাশা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়