রাজস্ব আদায় ও কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান

বিগত ৩ জুন ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন নিয়ে আগামীর পথে বাংলাদেশ শিরোনামে ২০২১-২২ অর্থবছরের ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার জীবন-জীবিকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। জিডিপির ৬.১ শতাংশ ধরে ঘাটতি বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে যা টাকার অঙ্কে ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক খাত থেকে নেওয়া হবে ৯৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। করোনার ধাক্কা সামলাতে সরকার আয়ের দিকে বেশি নজর দেওয়ার কারণে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব খাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা এবং করবহির্ভূত আয় ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের মোট ব্যয়ের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। 

এখানে লক্ষণীয়, আমাদের উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি। যা হওয়া উচিত নয়। দেশীয় শিল্পের ক্ষেত্রে করহার হ্রাস ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও উল্লেখিত প্রবৃদ্ধির জন্য কী পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে সেটি নির্দিষ্ট করা হয়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে রাজস্ব বাড়ানো না গেলে সরকারের পক্ষে বড় ধরনের প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব না। অন্যদিকে সামগ্রিক কর ব্যবস্থার সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো না গেলে রাজস্ব আয় বাড়ানোও কষ্টসাধ্য হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মোট দেশজ উত্পাদনের বিপরীতে কর আদায়ে বিশ্বে অন্যতম দুর্বল অবস্থানে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে একবারে নিচের দিক থেকে ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫তম। গত বছর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত কর জিডিপির একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে কর আদায় ৯.৯০ শতাংশ। ইকোনমিক আউটলুকের প্রতিবেদনে ভারতে ১৯.৬৭ শতাংশ ও পাকিস্তানে ১৪.৮৮ শতাংশ। জানা যায়, দেশে প্রচুর পরিমাণে করযোগ্য মানুষ রয়েছেন যারা কর দেন না। এজন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে নতুন কর আরোপ না করে কর ফাঁকি ও অর্থ পাচাররোধে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। 

২০১৯ সালে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বছরে যত টাকা আদায় হয় তার শতকরা ৩৬ ভাগ টাকা বিদেশে পাচার হয়। সংস্থাটির মতে সিংহভাগ টাকা পাচার হয় আমদানি ও রপ্তানির নামে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কর আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। আঙ্কটাডের এই তথ্য অনুযায়ী ঐ বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সে সময়ে ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশের প্রায় সব দেশ থেকেই কমবেশি অর্থ পাচার হয়ে যায়। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কর আদায়ের ৩৬ থেকে ১১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ পাচার হয়ে যায়। উন্নত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য হয় তার ৭ শতাংশের সমপরিমাণ মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে হয়। ২০১৫ সালেই অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৯তম। বিগত ছয় বছরে এ অবস্থান আরো বহুগুণে বেড়েছে। সম্প্রতি সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের কী পরিমাণ অর্থ পাওয়া গেছে সে তথ্য পত্রিকান্তরে সবাই জেনেছে। অর্থ পাচার রোধ করা গেলে দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ত, উৎপাদন বাড়ত, সেই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতো। ফলে সরকারের ঘাটতি বাজেট ধরার প্রয়োজন হতো না। করোনা দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। দেশের ছোট বড় সব খাত এবং ব্যক্তি পর্যায়েও দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। 

এরকম পরিস্থিতিতে কর আদায়ও একটা বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দেশের উন্নয়ন তথা বাজেট বাস্তবায়নে প্রয়োজন অর্থের। দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৫২ শতাংশ ৫ শতাংশ ধনী শ্রেণির হাতে আর নিম্ন শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের হাতে ৪ শতাংশ সম্পদ। কাজেই সম্পদ কর আদায়ের ওপর জোর দিতে হবে। এ ছাড়া ১৭ কোটি মানুষের দেশে বর্তমানে ই টিআইএনধারীর সংখ্যা ৬১ লাখ ৫১ হাজার ৮৬৬ জন। এর মধ্যে ৫০ লাখ টিআইএনধারীর সামর্থ্য থাকলেও রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ২৫ লাখ ৫৪ হাজার ৪৩ জন। (২২ মে ২০২১ যুগান্তর) ৪৯ শতাংশ করযোগ্য টিআইএনধারী রিটার্ন জমা দেন না। করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন জমা না দিলে আয়কর আইন অনুযায়ী জরিমানা, সরল সুদ ও বিলম্ব সুদ আরোপের বিধান রয়েছে। দেশের এই যে বিরাটসংখ্যক করযোগ্য ব্যক্তি কর প্রদান করেন না এবং যারা কর আদায় কার্যক্রমে নিয়োজিত থেকে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করছেন এদের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক আদৌ কি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে? এ বিষয়ে কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। তবে এটুকু বোঝা যায় সত্যি সত্যি তেমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কর আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি কর ফাঁকির প্রবণতা অনেক কমে যেত এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। করহার বৃদ্ধিতে কর ফাঁকির প্রবণতা বেড়ে যায় তাই করহার বৃদ্ধির কথা চিন্তা না করে কীভাবে বেশিসংখ্যক মানুষকে কর জালের আওতায় আনা যায় সে চেষ্টা করতে হবে। ২০১৮ সালে সিপিডির 

এক জরিপে দেখা যায়, কর দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এমন ৬৮ শতাংশ মানুষ কর দেন না। কর দেন মাত্র ৩২ শতাংশ সামর্থ্যবান মানুষ। ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন কর ব্যবস্থায় দুর্নীতি রয়েছে। আর ৫০ শতাংশ মনে করেন কর ব্যবস্থা জটিল। অবশ্য বর্তমানে স্বল্প পরিসরে হলেও অনলাইন পদ্ধতিতে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জানা গেছে, করোনার ধাক্কায় ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আয় কমেছে ৪১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। সংশোধিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাত্ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায় কমেছে ৪১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এর ফলে দেশে সার্বিকভাবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এনবিআরের স্বল্পসংখ্যক জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে বিরাটসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে করজালের আওতায় আনা দুরূহ ব্যাপার। এজন্য সরকারকে বেসরকারি যে সব অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কর সচেতনতা নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করছে এবং জনগণকে কর দেওয়ার ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াচ্ছে এবং উদ্বুদ্ধ করছে তাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে এবং তাদের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করলে এ বিষয়ে আশানুরূপ ফল পাওয়া যেতে পারে। এখানে আর একটা কথা না বল্লেই নয়, তা হলো মানুষ কর দিবে কিন্তু সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাবে না তা হয় না। তাই জনগণের কাছ থেকে কর গ্রহণের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানের বিষয়টিও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক, অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/কেকে